কক্সবাজারে সংক্রমণ বাড়ছে, এরপরও ঢিলেঢালা লকডাউন

 

কক্সবাজারে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে, বাড়ছে মৃত্যুও। সংক্রমণ রোধে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলা এবং পাঁচটি রোহিঙ্গা শিবিরে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হলেও তা পালিত হচ্ছে ঢিলেঢালাভাবে।

সড়কে চলছে ছোট–বড় অসংখ্য যানবাহন। হাটবাজার, দোকানপাট, বিপণিবিতানগুলোতেও মানুষের ভিড়। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোর প্রবেশমুখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া পাহারা থাকলেও শিবিরের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই।

তবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকসহ লোকজনের যাতায়াত নেই। জেলার বিনোদনকেন্দ্রগুলোও বন্ধ। ১ এপ্রিল থেকে সৈকতে পর্যটকের সমাগম নিষিদ্ধ করে জেলা প্রশাসন। আজ শনিবার পর্যন্ত তা কার্যকর রেখেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামীকাল ৬ জুন উখিয়া ও টেকনাফের কঠোর লকডাউনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। একই সঙ্গে সময়সীমা শেষ হচ্ছে সৈকতের বিধিনিষেধেরও।

এই সময়সীমা বাড়ানো হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আমিন আল পারভেজ শনিবার বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের সিদ্ধান্তে ২৩ মে থেকে সীমান্তের দুই উপজেলা টেকনাফ ও উখিয়াতে কঠোর লকডাউন করা হয়। দুই উপজেলায় লকডাউন বাড়ানো হবে কি না, তার সিদ্ধান্ত জানা যাবে কাল রোববার। সৈকতের পর্যটক নামতে পারবেন কি না, সে সিদ্ধান্তও ওই দিনই নেওয়া হবে।

এদিকে শনিবার সকাল থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত টেকনাফ পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, লকডাউন চলছে ঢিলেঢালাভাবে। সড়কজুড়ে ছোট–বড় যানবাহনের দৌড়ঝাঁপ। যানবাহনে লোকজনের গাদাগাদি অবস্থা। দোকানপাট, হাটবাজারের বেচাবিক্রিতে প্রচুর লোকসমাগম অব্যাহত রয়েছে। সবকিছুই চলছে যেন স্বাভাবিক অবস্থায়। অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও পথচারীদের মুখে নেই মাস্ক। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে নামলে অবশ্য উধাও হয় যানবাহন। ভ্রাম্যমাণ আদালত চলে যেতেই সড়ক ভরপুর হয় রিকশা, ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, টমটম, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, ট্রাক, মিনিবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে। মো. আলমগীর (৩৪) নামের একজন টমটমচালক বলেন, ‘আর কত দিন ঘরে বসে থাকব? স্ত্রী, পাঁচ ছেলেমেয়ে না খেয়ে আছে।’

দোকানপাটের অবস্থাও একই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এলেই বন্ধ হয় দোকানপাটের শাটার। তাঁরা গেলে সেই আগের অবস্থা। কোথাও কোথাও লকডাউন অমান্য করে কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যপদের প্রার্থীকে নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি গণসমাবেশ চালাতে দেখা গেছে।

ঢিলেঢালা লকডাউন প্রসঙ্গে উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পারভেজ চৌধুরী বলেন, লকডাউন বাস্তবায়নের করতে উপজেলা প্রশাসন দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। লকডাউন কার্যকর করতে ও স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য এ পর্যন্ত তিন শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। লকডাউন অমান্য করে গণসমাবেশ করায় সরকার–দলীয় ইউপির একজন চেয়ারম্যান প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে ইউএনও বলেন, এর পাশাপাশি অন্য প্রার্থীদেরও সতর্ক করা হয়েছে।

পাশের উপজেলা উখিয়াতেও চলছে ঢিলেঢালা লকডাউন। সড়কে চলছে বিভিন্ন যানবাহন। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলছে টমটমসহ ছোট যানবাহনগুলো।

এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) এস এম রাকিবুর রাজা বলেন, দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকায় যানবাহনের সংকট দেখা দেয়। এখন ছোট যানবাহন নিয়ে লোকজন চলাফেরা করছেন। কিছু টমটম, অটোরিকশায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের অভিযোগ আছে। এসব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রেও কাজ করছে ট্রাফিক পুলিশ।

সকাল ১০টায় সরেজমিন টেকনাফের শালবন রোহিঙ্গা শিবিরে দেখা যায়, শিবেরের ভেতরে রোহিঙ্গারা স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা করছে। অধিকাংশ রোহিঙ্গার মুখে মাস্ক নেই। রহিমা বেগম (৩৪) নামের একজন নারী বলেন, তাঁর পরিবারের সদস্য পাঁচজন। এ পর্যন্ত তাঁদের কেউ মাস্ক দেয়নি।

তবে শিবিরের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ আছে। একটি মুদিদোকানের মালিক রোহিঙ্গা নবী হোসেন (৪৫) বলেন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) না থাকলে তিনি দোকান খোলেন। না হলে দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে যাবে।

টেকনাফের নয়াপাড়া, জাদিমোরা শিবিরেও একই অবস্থা দেখা গেছে। শিবিরের প্রবেশের রাস্তার মুখে এপিবিএন সদস্যরা পাহারা দিচ্ছেন। কিছু রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন পথ দিয়ে বেরিয়ে টেকনাফ সড়কে এসে যানবাহনে এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে।

উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, বালুখালী আশ্রয়শিবিরেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। যত্রতত্র লোকসমাগমও। তবে শিবিরের ভেতরের সড়কগুলোতে যানবাহনের চলাচল নেই। সেখানে এপিবিএন সদস্যরা পাহারা বসিয়েছেন। কিছু রোহিঙ্গাকে বাইরে যাওয়ার সময় আটক করে পুনরায় ক্যাম্পের ভেতরে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

করোনার সংক্রমণ রোধে ২১ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত উখিয়ার চারটি এবং টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা শিবিরে কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সংক্রমণ বেড়ে গেলে লকডাউন বাড়িয়ে ৬ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানো হয়। এখন তৃতীয় দফায় আরও এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে প্রশাসনে।

রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার-১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম তারেক বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে লকডাউন শতভাগ কার্যকর করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল বৃদ্ধি করার পাশাপাশি হ্যান্ড মাইকে প্রচার–প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে রাস্তাঘাটে রোহিঙ্গাদের বের হতে দেওয়া হচ্ছে না।

সিভিল সার্জনের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৩ জুন পর্যন্ত ৪৪ হাজার ৬০ জন রোহিঙ্গার নমুনা পরীক্ষা করে তার মধ্যে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৮২ জনের। এর মধ্যে উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের ১ হাজার ৭০ জন এবং টেকনাফে ২১২ জনে করোনা পজিটিভ হয়েছেন। করোনায় রোহিঙ্গা শিবিরে ইতিমধ্যে মারা গেছেন ১৭ জন। শিবিরের কয়েকটি আইসোলেশন সেন্টারে বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন করোনায় আক্রান্ত ২৩৫ জন রোহিঙ্গা। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ।

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অনুপম বড়ুয়া বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে স্বাস্থ্যবিধি ঠিকমতো মানা হচ্ছে না। যত্রতত্র লোকসমাগম হচ্ছে। কাজকর্মের জন্য রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে চলে যাচ্ছেন, আবার ফিরে আসছেন। তা ছাড়া শরণার্থীদের মানবিক সেবায় যুক্ত এনজিও কর্মীরা প্রতিদিন ক্যাম্পে যাওয়া-আসা করছেন।

এনজিও কর্মীদের অনেকে কক্সবাজারের বাইরের জেলায় গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে ক্যাম্পে যাতায়াত করছেন। তাঁরা মিশছেন কক্সবাজার শহর, উখিয়া ও টেকনাফের মানুষের সঙ্গে। তাঁদের কারও কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সংক্রমণ বাড়ছে। সংক্রমণ রোধ করতে হলে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পকে পৃথক করে কঠোর লকডাউনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যাতে রোহিঙ্গারা এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে এবং ক্যাম্পের বাইরে যাতায়াত করতে না পারে। আর সব রোহিঙ্গার জন্য মাস্ক নিশ্চিত করতে হবে।

সংক্রমণ বাড়ছে জেলাতেও

সর্বশেষ গত শুক্রবার কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ল্যাবে ৫৬০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তার মধ্যে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ৫৪ জনের। এর মধ্যে উখিয়া উপজেলায় রয়েছেন ১৬ জন, টেকনাফে ৮, চকরিয়ায় ৩, কক্সবাজার সদরে ২, পেকুয়ায় ১, মহেশখালীতে ২ এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ১৭ জন।

মেডিকেল কলেজ ল্যাব থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি জুন মাসের প্রথম চার দিনে জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৯৯ জনের। মে মাসে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২ হাজার ২০৪ জনের। এপ্রিল মাসে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ জনের। অর্থাৎ, ২ মাস ৪ দিনে জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে মোট ৪ হাজার ৪৬০ জনের। আগের এক বছরে জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ৫৩ জনের। চলতি বছরে জেলায় করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। জেলায় এ পর্যন্ত মোট করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫১৩। জেলায় করোনায় এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৯৫ জন।

জেলায় করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে উপজেলাভিত্তিক হিসাবে কক্সবাজার পৌরসভাসহ সদরে সর্বোচ্চ আক্রান্ত ৪ হাজার ৫৬৫ জন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্ত উখিয়াতে ১ হাজার ২৮৬ জন। এরপর টেকনাফে আক্রান্ত রয়েছেন ৯৪৭ জন, চকরিয়াতে আক্রান্ত ৭৬৮, রামুতে ৬৪৭, মহেশখালীতে ৬৩৩, পেকুয়ায় ২৭৫ ও কুতুবদিয়ায় ১১০ জন।

সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে হোম আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন ৮৪৬ জন। আর প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩৯৫ জন। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে হাসপাতালে ৫২ জন, রামুতে ১৭, চকরিয়ায় ৪ ও বিভিন্ন বেসরকারি আইসোলেশন সেন্টারে রয়েছেন ৮৭ জন। এসব আইসোলেশন সেন্টারে অক্সিজেন সরবরাহসহ আধুনিক চিকিৎসার আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি রয়েছে।

আরও খবর