নদীর বালি নদীতে রেখেই বাঁকখালীর ড্রেজিং!

সুনিল বড়ুয়া •

কক্সবাজারের রামুতে নদীর বালি নদীতে রেখেই ঐতিহ্যবাহী বাঁকখালী নদীর ড্রেজিং-চলছে। উপজেলার হাইটুপি, গাউচ্ছাপাড়া, রাজারকুল আতিক্কাবিবির ঘাট এলাকাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে এ অভিনব! ড্রেজিং কার্য়ক্রম।

“নদী থেকে স্কেভেটর দিয়ে বালি তুলে সেই বালি রাখা হচ্ছে নদীর বুকেই। আবার সেই বালি নিয়ে যাওয়ার জন্য নদীর তলদেশ ভরাট করে তৈরী করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের রাস্তা। এ অবস্থায় বর্ষা ঘনিয়ে আসায় ড্রেজিং-এর সিংহভাগ বালি নদীতেই তলিয়ে যাবে।” এমন আশংকার কথা বললেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রামু শাখার সভাপতিও নাট্যজন মাষ্টার মো. আলম।

অন্যদিকে সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাজ নানান অনিয়মের মধ্যদিয়ে যেনতেনভাবে চললেও সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনের কোনো তদারকি নেই বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল।
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দাবি, নদীটির প্রায় সাড়ে ২৮ কিলোমিটার ড্রেজিং-এর মধ্যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে। বর্ষার আগেই বাকি কাজ শেষ হবে এবং এসব বালি সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জানাগেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্প এটি। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে দুই উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের ১৯ হাজার ৪’শ হেক্টর জমি চাষাবাদের আওতায় আসবে। বন্যা থেকে রক্ষা পাবে রামু সদরের ৩ লাখ মানুষ। পাশাপাশি নদী ভাঙনের হাত থেকে রেহাই পাবে অন্তত ২ হাজার পরিবার।

এদিকে এমন পরিস্থিতিতে চলমান এ প্রকল্পের রামুর বিভিণ্ন অংশে কাজ পরিদর্শন শেষে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নেতৃবৃন্দসহ সচেতন মহল।
“নদী ড্রেজিং মানে, নদী থেকে বালু বা মাটিগুলো তুলে নিরাপদ দুরত্বে রাখা হবে, আমরা এটাই বুঝি। কিন্তু বাঁকখালীর এই খনন কাজ দেখে আমরা বিষ্মিত হয়েছি।” বললেন মাস্টার মো. আলম।

তিনি আরও বলেন, নদী থেকে বালি উত্তোলন করে নদীতেই রাখা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেই বালি নিয়ে যাওয়ার জন্য আবার উল্টো নদীর তলদেশ ভরাট করে রাস্তাও করা হয়েছে।
কিন্তু যেভাবে ধীর গতিতে বালু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আমরা আশংকা করছি, বর্ষার আগে এসব বালুর সিংহভাগ নদীতেই চলে যাবে। তাই আমরা এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।
“বাঁকখালী নদী ড্রেজিং এটি রামু-কক্সবাজারের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের মত। কিন্তু ড্রেজিং এর কাজটি যথাযতভাবে না হলে সরকারের মহৎ উদ্যোগের সুফল পাবেনা জেলাবাসী। বলেন কক্সবাজার বেতারের সংগীত প্রযোজক, সাংস্কৃতিক সংগঠক মো. বশিরুল ইসলাম।

বশির আরও বলেন, শুধু ড্রেজিং -এ অনিয়ম নয়,এসব বালি নিয়েও নানা অনিয়ম চলছে।। কিন্তু এসবে আমাদের মাথা ব্যাথা নয়,আমরা চাই ড্রেজিং এবং বাঁধের কাজগুলো যথাযথভাবে হউক। কারণ এখানে লাখ লাখ মানুষের স্বার্থ জড়িত।
অধ্যাপক নীলোৎপল বড়ুয়া জানান, বাঁকখালী নদী ভরাটের কারণে বন্যাসহ নানা ভোগান্তি আমাদের পোহাতে হয়। দীর্ঘদিন পর হলেও নদীটি ড্রেজিং করা হচ্ছে এটি আমাদের জন্য সৌভাগ্যের।

কিন্তু যেভাবে কাজ চলছে তা কতটুকু কার্যকর কাজ হবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। এমনকি বর্ষার আগে তা সম্পন্ন করা যাবে কিনা তা নিয়েও আমরা সন্দিহান। আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনের দৃষ্ঠি আকর্ষন করছি।

রামুর বাঁকখালী উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির মাস্টার কিশোর বড়ুয়া জানান, এই নদীর সাথে রামু-কক্সবাজারের লাখ লাখ মানুষের জীবন জীবিকা জড়িত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্তই স্বদিচ্ছার কারণে বাঁকখালী নদী খননের এই বিশাল অংকের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু যেভাবে খনন কাজ চলছে,স্থানীয়রা কতটুর এর সুফল পাবে তা নিয়ে আমরা চিন্তিত।

তিনি বলেন, নদীর তলদেশের একপাশ খনন করা হচ্ছে। খননের পর সেই বালিগুলো আবার নদীর তলদেশেই রাখা হচ্ছে । যেকারণে ওই পাশটি অখনন অবস্থায় থেকে তো যাচ্ছেই অন্যদিকে খননের বালি গুলোও যেকোনো সময় বৃষ্ঠি হলে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
যদি তাই হয়, এটি খননের নামে প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনের কার্যকর ভুমিকা চাই।

প্রকল্পে যা যা আছে-
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্রে জানা গেছে, বাঁকখালী নদী ড্রেজিং ও খনন করে নদীর নাব্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নৌ-চলাচলের পথ সুগম করা, দুর্য্যেগপূর্ণ মুহুর্তে সাগরের নৌকা/ট্রলার এর নিরাপদ অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পোতাশ্রয় হিসাবে বাঁকখালী নদী ব্যবহার করা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে ঘরবাড়ি, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান রক্ষার জন্য ২০১৬ সালে প্রায় ১৯৫ কোটি ৫৪৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্প গ্রহণ করে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ওয়েষ্টান ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পে নদী ড্রেজিংছাড়াও রয়েছে, ৪.৬৫০ কিলোমিটারনদীর তীর সংরক্ষণ, তিন কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ/পুনরাকৃতিকরণ, ২টি রেগুলেটর নির্মাণ ও ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ। ২০১৬ সালের জুনে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ওয়েষ্টান ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড-এর কাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. সরওয়ার নামের ব্যক্তি মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, নদীর দুইপাশে জায়গা সংকটের কারণে বালিগুলো নদীর বুকে রাখা হয়েছে। আগামী একমাসের মধ্যে সব বালি তুলে নেওয়া হবে এবং পিকআপ চলাচলের জন্য ভরাট করা মাটিও তুলে ফেলা হবে।
প্রকল্পের ডিজাইন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, হাইটুপী অংশে পাশে ৪০ মিটার ড্রেজিংয়ের কথা থাকলেও দুইপাশে জায়গা না থাকায় তা করা যাচ্ছেনা।
এদিকে সরকারের এত বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তদারকিতে উপজেলা প্রশাসনের উদাসীনতা আছে বলেও মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন নেতৃবৃন্দ।
যদিও রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রণয় চাকমা বলেন, এ প্রকল্পটি জেলা থেকে তদারকি করা হয়। এখানে উপজেলা প্রশাসনের কোনো এখতিয়ার নেই। কেউ অভিযোগ করলে তা আমরা দেখতে পারি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, এ প্রকল্পে সাড়ে ২৮ কিলোমিটার ড্রেজিং-এর কাজ ছিল, সেখান থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ২৫ কিলোমিটার ড্রেজিং সম্পন্ন হয়েছে। নদীর দুইপাশে পাহাড় থাকাতে কয়েক কিলোমিটার কাজ করা যাবেনা।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের কস্তুরাঘাট অংশে ৮০ মিটার এবং রামু হাইটুপী অংশে ৪০ মিটার নদীর তলদেশ ড্রেজিং কথা রয়েছে কিন্তু অনেক জায়গায় সেভাবে করা যাচ্ছেনা। তবে যতটুকু তারা কাটবে ততটুকুই বিল পাবে বলেও জানান তিনি।
নদীর বালি ড্রেজিং-এর পর নদীতে বালি হচ্ছে, এ বিষয়ে তিনি বলেন, রামুর হাইটুপী অংশে নদীর দুইপাশে সব জমিই ব্যক্তিমালিকানাধীন। তাই সেখানে বালি রাখা যাচ্ছেনা। যে কারণে নদীর কিনারায় বালু গুলো রাখা হচ্ছে। বর্ষার আগেই এসব বালি সরিয়ে ফেলা হবে।

বালি উত্তোলনের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, খুব শীঘ্রই বালি বেচার জন্য প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে। ইতিমধ্যে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, শুধুমাত্র রেজুলেশনে সই বাকি আছে। এটি শেষ হলে আগামী দুয়েক দিনের মধ্যেই সেখান থেকে বালি সরানোর কাজ শুরু করা হবে।
তবে নদীর দুইপাশে প্রয়োজনমত জায়গা না থাকায় সিডিউল অনুযায়ী কাজ হতে পারছেনা বলে তিনি স্বীকার করেন।

আরও খবর