মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী :
মোহাম্মদ শফিউল আলম। পিতার নাম ছৈয়দ হোসাইন ও মাতার নাম আলমাস খাতুন। অত্যন্ত সুনাম, সততা, দক্ষতা ও সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আমলাতান্ত্রিক পদ মন্ত্রীপরিষদ সচিব হিসাবে সুদীর্ঘ ৪ বছর। দেশের এ মেধাবী সন্তান ১৯৫৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। সে হিসাবে গত শনিবার ১৪ ডিসেম্বর ছিলো তাঁর ৬০ তম জন্মদিন। কক্সবাজারবাসীর গর্বের ধন উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের রুমখা পালং গ্রামের বাসিন্দা মোহম্মদ শফিউল আলম প্রশাসনে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়েও কোনদিন জন্মদিন পালন করছেন এমন তথ্য দিতে পারেননি, তাঁর ছোট ভাই হলদিয়া পালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শাহ আলম ও তাঁর ভাগিনা তোফায়েল আহমদ সহ তাঁর স্বজনেরা।
মন্ত্রীপরিষদ সচিবের পদমর্যাদায় ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসাবে চাকুরীরত মোহাম্মদ শফিউল আলম গত শুক্রবার ১৩ ডিসেম্বর ২ দিনের সফরে স্বস্ত্রীক কক্সবাজার এসেছিলেন। উঠেছিলেন কক্সবাজার শহরের হিলটপ সার্কিট হাউসে।
১৪ ডিসেম্বর শনিবার ঊষালগ্নে হিলটপ সার্কিট হাউসে হাজির হন, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন, সাথে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক ও জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের সহধর্মিণী গুলশান আরা কামাল। তাঁদের হাতে ছিলো একটি ফুলের তোড়া, জন্মদিনের কেক সহ আরো বিভিন্ন পদের নাস্তা। স্বস্ত্রীক জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ও তাঁর সহধর্মিণীকে সাতসকালে এ অবস্থায় দেখে বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম ও তাঁর সহধর্মিণী শামীমা সুলতানা আলমের চোখ চনাবড়া। তাঁরা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলেন, ১৪ ডিসেম্বর এই কৃর্তিমান পুরুষের ৬০ তম জন্মদিন।
এ উপলক্ষ্যে জেলার প্রধান নির্বাহী জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন স্বস্ত্রীক বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আলমকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছেন। কি আর করা। সাইরাপ্রাইজ দিলেন-কক্সবাজারের অভিবাবক জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ও তাঁর সহধর্মিণী গুলশান আরা কামাল। সারপ্রাইজ গ্রহন করলেন, দেশের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সর্বোচ্চ অভিবাবকের দীর্ঘ ৪ বছর দায়িত্ব পালন করা বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আলম সহধর্মিণী শামীমা সুলতানা আলম। কামাল হোসেন-গুলশান আরা দম্পতি থেকে স্বাচ্ছন্দ্যে ফুলের তোড়া গ্রহন করলেন শফিউল আলম-শামিমা সুলতানা দম্পতি। জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন ও তাঁর সহধর্মিণীর আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে কেকও কাটলেন আনুষ্ঠানিকভাবে।
মনে হয়, ৬০ বছরে জীবনের এই প্রথম জন্মদিনের ঊষালগ্নে কৃর্তিমান পুরুষ মোহাম্মদ শফিউল আলম ফুলেল শুভেচ্ছা গ্রহন করে কেক কেটে জন্মদিন পালন করছেন। স্বল্পসময়ের জন্য হলেও জন্মদিনের নিরুত্তাপ আনন্দটা ভাগাভাগি করে উপভোগ করলেন উপস্থিত সকলে হিলটপ সার্কিট হাউসের গোলঘরে। কিন্তু এ খবরটা কোন গণমাধ্যমে আসেনি।
কক্সবাজারের ভূমিপুত্র মোহাম্মদ শফিউল আলম দেশের প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মন্ত্রীপরিষদ সচিব হিসাবে সুদীর্ঘ ৪ বছর দায়িত্ব পালন করে শেষ কর্মদিবস কাটিয়েছেন গত ২৮ অক্টোবর। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রী পরিষদের সে দিনের সভায় মোহাম্মদ শফিউল আলমের দায়িত্ব পালন, পেশাদারিত্ব ও কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সুনাম, সততা, দক্ষতা ও সফলতার সাথে আত্মতুষ্টি নিয়ে জনপ্রশাসনে সুদীর্ঘ ৩৬ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে ২৯ অক্টোবর থেকে তিনি অবসরে গেছেন। ইতি টানছেন সুদীর্ঘ তিন যুগের আমলাতান্ত্রিক জীবনের।
কক্সবাজারের কৃতিসন্তান মোহাম্মদ শফিউল আলমের (পরিচিতি নম্বর : ১০৯৮) সরকার থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়ে তাঁকে মন্ত্রীপরিষদ সচিবের পদমর্যাদা ও সে অনুযায়ী অন্যান্য সকল সরকারি সুবিধাদি দিয়ে গত ১ নভেম্বর হতে পরবর্তী ৩ বছরের জন্য ওয়াশিংটনস্থ বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ শফিউল আলম গত ১ নভেম্বর বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসাবে সেখানে যোগদান করেছেন।
চৌকষ ও দূরদর্শী এই মেধাবী কর্মকর্তা বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে ১৯৮৩ সালের ২৭ আক্টোবর তিনিসহ আরও ৫৫ জন একসাথে যোগদান করেন, দেশের বুনিয়াদি ও সিদ্ধান্তগ্রহনকারী সরকারি চাকুরি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ২১তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
কক্সবাজারবাসীর গর্বের ধন উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের রুমখা পালং গ্রামের বাসিন্দা মোহম্মদ শফিউল আলম প্রশাসনে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়েও পারতপক্ষে তিনি সাদামাটা জীবন যাপন করতে পছন্দ করতেন। দেশের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সর্বোচ্চ অভিবাবকের পদ হিসাবে পরিচিত কেবিনেট সেক্রেটারির দায়িত্ব থেকেও মোহাম্মদ শফিউল আলম নিরংহকারী ও সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি কক্সবাজার জেলার প্রথম নাগরিক, যিনি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন পদ অলংকৃত করে কক্সবাজার জেলাবাসীকে গৌরবান্বিত করেছেন। মোহাম্মদ শফিউল আলম ১৯৭৫ সালে পালং মডেল হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭৭ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসি, ১৯৭৯ সালে ওমরগনি এমইএস কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএ ও ১৯৮০ সালে বঙ্গবন্ধু ল’ টেম্পল থেকে এলএলবি পাশ করেন। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজীতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮২ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (প্রশাসন) উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৩ সালের ২৭ অক্টোবর বান্দারবনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৯৪ সালে শফিউল আলম যুক্তরাজ্যে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডেভেলপমেন্ট এডমিনিস্ট্রেশনের উপর এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ভূমি মন্ত্রনালয়ের সিনিয়র সচিব, রাষ্ট্রপতির সচিব, ভূমি আপীল বোর্ডের চেয়ারম্যান, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের এমডিএস, রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার, ময়মনসিংহ ও মাগুরার জেলা প্রশাসক, ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার ইউএনও সহ প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সুদীর্ঘ ৩৬ বছর অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, স্পেন, ইতালি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, পাকিস্তান, নেপাল, কানাডা, জার্মানি, চীন, হংকং, কেনিয়া, গায়ানা, পানামা, তুরস্ক, কাতার, হাইতি ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে।
তিনি একজন অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন জনকল্যাণমুখী সরকারি কর্মকর্তা। সেবাপ্রার্থীদের সার্বিক সেবা দেওয়ার মাধ্যমে এদেশের গরিব, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিলো তাঁর কর্মজীবনের ব্রত।
মোহাম্মদ শফিউল আলম শহীদ পরিবারের একজন গর্বিত সন্তান। ১৯৪৭ সালের ৫ মে জম্ম নেয়া তাঁর বড় ভাই এটিএম জাফর আলম মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে শাহাদত বরণ করেন। শহীদ হওয়ার আগে এটিএম জাফর আলম সিএসপি (প্রশাসন) এ উত্তীর্ণ একজন কর্মকর্তা ছিলেন। নিয়োগ পেয়েছিলেন, নোয়াখালী কালেক্টরেটের একজন কর্মকর্তা হিসাবে। চলতি বছর এটিএম জাফর আলম সিএসপিকে সরকার মরণোত্তর দেশের সবচেয়ে পর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার স্বাধীনতা পদক প্রদান করেন।
বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আলম আগামী ১৯ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনের উদ্দ্যেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন বলে জানা গেছে। প্রসংগত, বর্তমান মন্ত্রীপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এর নিজ জেলা টাঙ্গাইল এবং সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব, বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আলমের শ্বশুরবাড়িও টাঙ্গাইল জেলায়।
প্রতিদিনের খবরগুলো আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-