ডেস্ক রিপোর্ট :

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সতর্ক রয়েছে প্রশাসন। কক্সবাজারের ৩১টি ক্যাম্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ আগামী বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাতজনিত ভূমিধসের আশঙ্কায় রয়েছে।
পাহাড়ের পাদদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস, ভূমিধস, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জীবনঝুঁকি প্রশমনে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে স্থানীয় প্রশাসনে। বর্তমানে ২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সদস্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাদের অন্যত্র স্থানান্তর ও ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারলে বড় রকমের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার উখিয়ার ক্যাম্প ১৭ পরিদর্শন ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের আয়োজনে সেখানে দুর্যোগবিষয়ক মহড়ায় যোগ দিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। উখিয়ায় আর্মি কো-অর্ডিনেশন সেলের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। তারা রোহিঙ্গা তরুণদের স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তৈরি করেছেন।
ইতিমধ্যে প্রায় ৪ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা যুবককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিধস, অগ্নিকা , সাইক্লোন-পরবর্তী উদ্ধারকাজের জন্য তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে এখন গ্যাস সিলিন্ডারে রান্না করা হয়। ন্যূনতম ৬-৭ থেকে ১৪-১৫ জনের একেকটি পরিবার। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর কোনো ঘরে আগুন লাগলে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে পুরো ক্যাম্পে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটতে পারে। এজন্য ফায়ার ফাইটিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা যুবকদের।
প্রতি ক্যাম্পে ৩০০ জন করে যুবক নিয়ে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং করানো হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। উল্লেখ্য, মাঝারি বর্ষণেও রোহিঙ্গা বসতির অনেক জায়গা তলিয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে পাহাড়ের খাদে মোটা পলিথিনের তাঁবু টানিয়ে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। এসব বসতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
খোলা আকাশের নিচে ন্যাড়া পাহাড়ের ওপর রোহিঙ্গা বসতিগুলোর আশপাশের সব গাছপালা কেটে শেষ করা হয়েছে। এখন সেখানে সীমিত পরিসরে গাছ লাগানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপে কিছুই করা যাচ্ছে না। বর্ষণে কাটা পাহাড়গুলো যেন ধসে না পড়ে সেজন্য সেনাবাহিনী বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ছোট ছোট স্লাব বসিয়ে ধস রোধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের ৩১টি ক্যাম্পে নতুন ও পুরনো মিলিয়ে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিককে নির্বিঘ্নে রাখতে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসন চেষ্টা চালাচ্ছে। দুর্যোগ মৌসুম শুরুর আগমুহূর্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও কাজ করছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের উখিয়ায় মধুর ছড়া রোহিঙ্গা শিবিরে সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দুর্যোগ মোকাবিলা মহড়ায় সামরিক ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেয়। মহড়ায় যোগ দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বর্তমান সরকার অত্যন্ত পারদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে, যা বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। এ মহড়া দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় পুরোপুরি সক্ষম।’
সেনাবাহিনীর কক্সবাজার এরিয়া কমান্ডার ও রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মো. মাঈন উল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘রোহিঙ্গা শিবিরে এ ধরনের মহড়া এবারই প্রথম। এতে সেনাবাহিনীর ৬৭২, স্বেচ্ছাসেবক ৩০০, অন্যান্য সংস্থার উদ্ধারকর্মী ও ৩০০ স্বেচ্ছাসেবকসহ ১ হাজার ৪০০ জন বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক অংশ নিয়েছেন।’
তিনি বলেন, এ মহড়া থেকে বোঝা গেছে, কত দ্রুত সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য সংস্থা দুর্যোগকবলিত লোকজনকে উদ্ধার এবং সেবা দিতে সক্ষম। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সত্যি কথা হলো, শুরুতে এখানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে যে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি হয়েছিল সেনাবাহিনী দায়িত্ব না নিলে কী অবস্থা হতো বলা কঠিন।
শুরুতে আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনীর পুরো ডিভিশনই রোহিঙ্গা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে কাজ করেছে। এখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। সেনা সদস্যরা সর্বোচ্চ সহানুভূতি দিয়ে রোহিঙ্গাদের বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিজেদের সংকট মোকাবিলায় তাদের সক্ষম করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
প্রতিদিনের খবরগুলো আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-