
দেশের শেষ সীমানা সেন্টমার্টিনস দ্বীপের কাছে সাগরের বুকে নোঙর করা থাকত বড় বড় জাহাজ। গভীর সাগরে সেসব জাহাজে তীর থেকে মানুষ তুলে দেওয়া হতো ইঞ্জিনচালিত নৌকাবোঝাই করে।
কার আগে কে কতজন তুলে দিতে পারে এমনই প্রতিযোগিতা হতো পাচারকারী সিন্ডিকেটের মধ্যে। কারণ মাথা গুনে পাচারকারীদের নগদ টাকা দেওয়া হতো। যে যত বেশি ‘মাথা’ মালয়েশিয়াগামী জাহাজে তুলে দিতে পারত তার আয় রোজগারও হতো বেশি।
মানবপাচারের হিড়িক পড়া সময় ছিল ২০১২-২০১৩ সাল। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সোনা আলী জানান, মানবপাচারের গডফাদার পোয়া মাঝির সিন্ডিকেটই সে সময় কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ পাচার করেছে। এখনো কেবল টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নেই রয়েছে অর্ধশতাধিক মানবপাচারকারী। তারা সব সময় সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে
উঠেছিল মানবপাচারকারীরা। শাহপরীর দ্বীপ ঘাট দিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগে বেশ কয়েকটি চালান মালয়েশিয়ায় গেছে বলে খবর রয়েছে।
পাচারকারীদের নতুন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। তবে র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের তৎপরতায় পাচারকারীরা সাময়িক পিছুটান দিয়েছে। ’
জানা গেছে, শাহপরীর বাসিন্দা আবুল হাশিম ওরফে পোয়া মাঝি (৪০) সবচেয়ে ভয়ংকর পাচারকারী হিসেবে পরিচিত। সাগর তীরের দ্বীপ ডাঙ্গরপাড়া গ্রামেই পোয়া মাঝির ঘর। শুরুতে তার ছিল দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ওই দুটি নৌকা নিয়েই মানবপাচার শুরু করেছিল পোয়া মাঝি। পরে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা কেনে মানবপাচারের জন্য। তার সহযোগীরা হচ্ছে একই এলাকার আবুল কালাম, ফিরোজ, হেলাল, জিয়াউল হক ভুলুসহ আরো কয়েকজন। মানবপাচার করে তারা অনেক সম্পদেরও মালিক এখন। পোয়া মাঝি সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদ ভবনসংলগ্ন জমি কিনে একটি পাকা বাড়িও নির্মাণ করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ৯টি পাচারের মামলা রয়েছে। সব মামলায় জামিন পেয়ে আবারও সে মানবপাচারে জড়িয়েছে।
সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুরুল আমিন বলেন, ‘পোয়া মাঝি সিন্ডিকেটের লোকজনের ভয়ে নৌঘাট এলাকায় সাধারণ লোকজনও যাতায়াত করত না। সিন্ডিকেটের লোকজন যাকেই পেত তাকেই ধরে তুলে দিত জাহাজে। এমনকি সেই সময় একটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কম্পানির দুই টেকনিশিয়ানকে পর্যন্ত ধরে মালয়েশিয়াগামী নৌকায় তুলে দিয়েছিল পোয়া মাঝির লোকজন। ’ তিনি জানান, পরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে গভীর সাগরের জাহাজ থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছিল।
সাবরাং এলাকার বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, মালয়েশিয়াগামী জাহাজে মাথা গুনে টাকা দেওয়ার কারণেই পাচারকারীরা বেশি বেশি মানুষ জোরপূর্বক ধরে নৌকায় তুলে দিত। এমনকি রাস্তা থেকেও ভবঘুরে শ্রেণির লোকজনকে বস্তায় ভরে জাহাজে তুলে দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনাও ঘটেছিল।
শাহপরীর দ্বীপ এলাকার মোহাম্মদ শফির ছেলে রহিমুল্লাহ গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, তাঁকেও ধরে পোয়া মাঝির লোকজন মালয়েশিয়াগামী জাহাজে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই জাহাজটি ধরা পড়ে যায় মিয়ানমারের নৌবাহিনীর হাতে। পুরো জাহাজের কয়েক শ মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয় মিয়ানমারের কারাগারে। পরে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ফিরে আসেন তিনি। এরপর টেকনাফ থানায় পোয়া মাঝিসহ ১৪ পাচারকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
রহিমুল্লাহ বলেন, ‘মানবপাচারের জাহাজে যে একবার উঠেছে সেই জানে দোজখ কাকে বলে। সেই জাহাজ থেকে থাই-মালয়েশিয়া সীমান্তের পাচারকারী জল্লাদদের হাতে পড়লে দেখা যায় আরো বড় দোজখ। ’
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়েই মানবপাচার অব্যাহত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মানবপাচারকারীর সংখ্যা বেড়েছে রোহিঙ্গা শিবিরভিত্তিক এলাকায়। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে কয়েক শ রোহিঙ্গা মানবপাচারকারী সক্রিয় রয়েছে।
পোয়া মাঝির অবস্থান সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার মানবপাচার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন।
সূত্র – কালেরকন্ঠ
প্রতিদিনের খবরগুলো আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-