রিয়াদের মৃত্যুর পর ঘুসের টাকা ফিরিয়ে দিল পুলিশ

ডেস্ক রিপোর্ট :

রাজধানীর পল্লবীতে ছিনতাইকারী সন্দেহে আটক যুবককে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ঘুস নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। যদিও পুলিশ হেফাজতে ভুক্তভোগী রিয়াদ হোসেনের (৩৪) মৃত্যুর পর টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে পরিবার।

তবে ঘুস নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে পুলিশ। অন্যদিকে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার কোনো আলামত না পেলেও ‘স্থানীয় অপরাধী গ্রুপে যুক্ত থাকার তথ্য রয়েছে’ বলে দাবি পুলিশের।

গত রোববার ভোরে রিয়াদকে ছিনতাইকারী সন্দেহে গণপিটুনির পর সোমবার ভোরে তিনি পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। তবে এখন পর্যন্ত হত্যায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

ভুক্তভোগীর স্ত্রী প্রিয়া বৃহস্পতিবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, গত রোববার ভোরে তার (রিয়াদ) ফোনে কল দেওয়ার পর জানতে পারি পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে গেছে। থানায় গিয়ে তাকে আহত অবস্থায় দেখতে পাই। তখন তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর থানায় ফেরত আনার পর আমাকে সঙ্গে করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখান থেকে ফের থানায় আনার পর তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন এসআই আশরাফুল। রাত ৯টার দিকে আমি ২০ হাজার টাকা জোগাড় করে তাকে দিই।

প্রিয়া বলেন, সোমবার সকালে ফোন দিলে এসআই আশরাফুল বলেন, রিয়াদকে কুর্মিটোলায় নেওয়া হচ্ছে। আপনি থানায় আসেন আগে। এরপর ৮টার দিকে টাকা ফেরত দিয়ে বলেন, আপনার স্বামীর চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন। এ টাকা ফেরত নিয়ে যান। অথচ ভোর ৪টায় স্বামীকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে, সে কথা তখনও বলেননি।

আমার স্বামী বলেছেন, কোনো পাবলিক তাকে মারেনি। ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মেরেছে। এরপর চিকিৎসা শেষে থানায় থাকার সময় কী হয়েছে, ওনারাই (পুলিশ) ভালো জানেন। রোববার কিংস্টন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে রাত দেড়টার দিকে আমি চলে আসি। এরপর তার সঙ্গে কী হয়েছে, আমি জানি না।

নিহত রিয়াদ হোসেন নিজের কেনা গাড়ি ভাড়ায় চালাতেন। এছাড়াও নাচ শিখতেন। সেই শখ থেকে শরীরে ডিজে ট্যাটু করেছিলেন। তবে তিনি কোনো অপরাধী দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি স্ত্রীর।

ভুক্তভোগীর স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া এবং তা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে এসআই আশরাফুল আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঘুস লেনদেনের বিষয়ে পল্লবী থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে পরিবারকে অভিযোগ করতে বলেছি। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদেরও জানিয়েছি বিষয়টি। এটার তদন্ত করা হবে। যদি সত্যতা মেলে, তাহলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া রিয়াদকে আমাদের হেফাজতে কোনো নির্যাতন করা হয়নি। তার এখানে অবস্থানের প্রতিটি মুহূর্ত সিসিটিভিতে রেকর্ড আছে।

ওসি আরও বলেন, এই এলাকায় (পল্লবী) বিভিন্ন অপরাধী গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে ডিজে গ্রুপের লিডার ছিল রিয়াদ। তারা গানবাজনা করত আবার গাড়ি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছিনতাইও করত। কয়েকদিন আগেও ডিজে গ্রুপ ছিনতাই করেছে। এ সংক্রান্ত তথ্য আমাদের কাছে আছে।

পুলিশের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত রোববার রাত ৩টায় পল্লবীর সেকশন-১২ এলাকায় মেট্রো রেলস্টেশনের নিচে ছিনতাইকারী সন্দেহে স্থানীয়রা রিয়াদকে হাতেনাতে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এ সময় তার প্রাইভেট কারে থাকা অজ্ঞাত দুই ছিনতাইকারী পালিয়ে যায়।

এ সময় সেনাবাহিনীর টহল টিম রিয়াদকে হেফাজতে নেয়। পরে তাকে থানায় নেওয়া হলে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখে ফিরিয়ে দেওয়ায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী। কুর্মিটোলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার করেন। সেনাবাহিনী রিয়াদের স্বজনদের নিয়ে থানায় ফিরে আসে।

এ সময় প্রয়োজনীয় আলামত জব্দের পর এসআই আশরাফুল আলম স্বজনদের নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার ভর্তি না করে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেন। এরপর দুপুরে রিয়াদকে নিয়ে পল্লবী থানার হাজতে রাখা হয়।

রোববার রাতে অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাকে স্থানীয় কিংস্টন হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিয়ে মধ্যরাতে ফের হাজতে নেওয়া হয়। এরপর রাত ৩টা ৫৫ মিনিটে ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে কুর্মিটোলা হাসপাতাল নেওয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আরও খবর