সাহাদাত হোসেন পরশ, ইন্দ্রজিৎ সরকার ও আব্দুল হামিদ :
প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল সচিবালয়। সেখানেই ঘটল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। গত বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রায় ছয় ঘণ্টা পুড়েছে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবন। পুরোপুরি আগুন নিভেছে আরও চার ঘণ্টা পর; দুপুর পৌনে ১২টায়। কয়েক স্তরের নিরাপত্তায় ঘেরা কেপিআইভুক্ত স্থাপনায় আগুনের ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও পুড়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি। সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনটি ৯ তলাবিশিষ্ট। আগুনে ওই ভবনের ষষ্ঠ থেকে নবম তলা পর্যন্ত সবকিছু পুড়ে অঙ্গার। আগুন নেভাতে গিয়ে সচিবালয়ের সামনের সড়কে ট্রাকচাপায় প্রাণ গেছে ফায়ার ফাইটার সোহানুর জামানের। তবে এ অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা– এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তে গঠন করা হয়েছে একাধিক কমিটি।
এদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার ঘিরে পক্ষে-বিপক্ষে নানা দাবি-দাওয়া ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্যেই সচিবালয়ে আগুনের এ ঘটনা অনেকের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গতকাল দুর্ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে একাধিক সংস্থা। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হবে। আগুনের সূত্রপাতের কারণ নির্ণয় করবে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুপুর সাড়ে ১২টায় বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে পুড়ে যাওয়া ভবনে যান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এ সময় তাঁর চোখে-মুখে বিষণ্নতার ছাপ দেখা যায়।
পুড়ে যাওয়া অফিস দেখে বিমর্ষ আসিফ পাশে থাকা সাখাওয়াত হোসেনকে বলেন, ‘আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।’ তখন তরুণ এ উপদেষ্টাকে সান্ত্বনা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা।
এর আগে সকালে সচিবালয়ের সামনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আগুনের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র কাজ করেছে কিনা, তা তদন্তের পর বলা যাবে। এই আগুনের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা নাশকতা দেখছেন কিনা– এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটি তদন্তের আগে আমি তো বলতে পারব না। তদন্তের পরে আপনাদের আমরা জানাব।
সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থ লোপাট ও দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, এখনও জানা যায়নি। আমাদের ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে, তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।’
‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের’ আওতায় মোতায়েন করা সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কিত গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সেনাসদরের কর্নেল-স্টাফ কর্নেল ইন্তেখাব হায়দার খান বলেন, ‘সচিবালয়ে আগুনের ঘটনার তদন্ত হবে। তদন্ত হলে আগুন লাগার কারণ জানা যাবে। সেখানে সেনাবাহিনী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সার্বিক সহযোগিতা করেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী কাজ করছে।’
সচিবালয়ের পুড়ে যাওয়া ভবন পরিদর্শন শেষে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, এই আগুন কোনো স্বাভাবিক ঘটনা মনে হয়নি। এটি পরিকল্পিত হয়ে থাকতে পারে। এটি দুর্ঘটনা, নাকি মানবসৃষ্ট পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র– সে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সরকারকে অস্থিতিশীল ও ব্যর্থ করার জন্য নানা ধরনের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এ ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো যেভাবে অ্যানালগ পদ্ধতিতে হ্যান্ডেল করি, ফাইলগুলো এভাবে রাখা উচিত নয়। এগুলো ডিজিটালাইজড করা দরকার।
গণপূর্ত সচিব হামিদুর রহমান খান বলেন, ভবনে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঝুঁকি নিরূপণ করা হবে।
আগুনের সূত্রপাত যেভাবে
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, বুধবার রাত ১টা ৫২ মিনিটে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। এর দুই মিনিট পর প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। এরপর আরও ১২টি ইউনিট যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ২০টি ইউনিট ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যায়, ভবনটির তিনদিকে একযোগে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, দুর্ঘটনা হলে কেন একসঙ্গে পৃথক তিনটি স্থানে আগুন লাগবে।
সকাল পৌনে ৭টায় সচিবালয়ের সামনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহেদ কামাল বলেন, ‘শর্টসার্কিট থেকে ওই আগুন লাগতে পারে। এক জায়গায় আগুন ধরলে বিদ্যুৎ লাইনের মাধ্যমে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এটি হতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক কারণ এখনও আমরা বের করতে পারিনি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, তিনটি জায়গায় একসঙ্গে আগুন দেখা গেছে। যখন স্পার্কিং হয়, যদি বিদ্যুৎ লাইনের শর্টসার্কিট হয়– এটি হতে পারে। তবে আমরা এটি এখনও নিশ্চিত বলব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তদন্ত শেষ করছি।’
সচিবালয় চত্বরের ফায়ার স্টেশনে সার্বক্ষণিক ৯ সদস্যের একটি টিম থাকে। এই দলের দু’জন বলেন, বুধবার গভীর রাতে প্রথমে তারা ৭ নম্বর ভবনের পশ্চিম পাশে আগুন দেখতে পান। আগুন নেভাতে গিয়ে দেখেন, ভবনের মাঝখানে ও পূর্বদিকেও আগুন জ্বলছে। মাঝখানের আগুন বেশি ছিল। তারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে অন্য ইউনিটগুলো চলে আসে। ভবনটির মূল ফটকে একাধিক তালা লাগানো ছিল। সেগুলো ভাঙতে সময় লেগে যায়। যার ফলে ভবনে উঠতে বিলম্ব হয়।
তারা আরও জানান, ভবনের প্রতি তলার মধ্যভাগের করিডোরে ডেকোরেশন করা, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার মতো পর্যাপ্ত উপাদান রয়েছে। এ কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ভবনে কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা নেই। চারদিকে আটকানো। এ কারণে আগুন নেভাতে সময় লেগে যায়।
অগ্নিনির্বাপণে অংশ নেওয়া তিনজন ফায়ার ফাইটার জানান, ভবনটির ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়াচ্ছন্ন থাকায় কাজ করতে খুব কষ্ট হয় তাদের। ধোঁয়া বের করতে ও ভেতরে পানি ছিটানোর কাজ সহজ করতে বাইরে থেকে জানালার গ্লাস ভেঙে দেওয়া হয়।
তারা জানান, ভবনটির চারটি ফ্লোরের করিডোর পুড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই চারটি ফ্লোরে থাকা বিভিন্ন অফিসের কাগজপত্র পুড়ে গেছে। এ ছাড়া কিছু কাগজপত্র পানিতে ভিজেও নষ্ট হয়েছে। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে ভবনটির আটতলায় আবার আগুন দেখা যায়। পরে নেভানো হয়।
৭ নম্বর ভবনের চিত্র
সচিবালয়ের ১ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকেই ৭ নম্বর ভবন। ৯ তলা এই ভবনে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দপ্তর। এ ছাড়া রয়েছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। আগুনে পুড়ে গেছে ষষ্ঠ তলায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, সপ্তম তলায় স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, অষ্টম তলায় স্থানীয় সরকার বিভাগের কিছু অংশ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের কিছু অংশ। এ ভবনের নবম তলায় রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।
গতকাল গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি কক্ষের সবকিছু পুড়ে ছাই। কোথাও কোথাও দেয়ালের অংশ খসে পড়েছে। সিঁড়ি ধসে গেছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পোড়া জিনিসপত্র, জানালার ভাঙা গ্লাস। ভবনের চারদিকে ফায়ার সার্ভিসের ছিটানো পানি। তার মধ্যে কয়েকটি কবুতর মরে পড়ে আছে। আগুন নেভার পর পুরো ভবনটি ঘিরে রেখেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পুড়ে যাওয়া অংশ থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সচিবালয়ের ভেতরে টহল দেন সেনাসদস্যরা। এ ছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা কড়া পাহারায় ছিলেন।
গতকাল সকালেও ৭ নম্বর ভবনে তল্লাশির কাজ করছিলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তাদের মধ্যে ফায়ার ফাইটার ইমরান শিকার ও মো. তরুণের সঙ্গে কথা হয়।
ইমরান বলেন, ৬ থেকে ৯ তলা পর্যন্ত সবকিছু পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে ভবনটি। কেউ হতাহত হয়নি। তবে আটতলায় পুড়ে মারা যাওয়া একটি কুকুর পেয়েছি। কুকুরটি কীভাবে এত ওপরে উঠল, বলতে পারছি না। অফিসের নথিপত্র, কম্পিউটার, আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
সচিবালয় ঘিরে দিনভর যা ঘটল
সরেজমিনে দেখা গেছে, সচিবালয়ের সামনের প্রধান ফটক পাহারায় পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। অফিস চলাকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবসংলগ্ন সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেটে দেখা দেয় দীর্ঘ লাইন। এই ৫ নম্বর গেট দিয়েই সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভেতরে প্রবেশ করানো হচ্ছিল। পরিচয়পত্র দেখে ভেতরে প্রবেশ করানোয় বেলা ১১টা পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর দীর্ঘ সারি ছিল। সচিবালয়ের প্রধান ফটকের সামনের রাস্তায় দুপুর পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পর এক পাশ খুলে দেওয়া হয়েছে। আশপাশে কিছু উৎসুক জনতা ভিড় করে।
বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ওয়ারাকা মাহবুব বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে বের হই। সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে একটু দেরিতে বাসা থেকে বের হয়েছি। সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত থাকতে হয়। কিন্তু আজকে সাড়ে ১০টার দিকে এসেছি। এখন লাইন দিয়ে সবাইকে ভেতরে প্রবেশ করানো হচ্ছে।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ভিফারুল ইসলাম ফুয়াদ বলেন, ‘৯টার আগেই অফিসের সামনে আসি। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। দুই ঘণ্টার বেশি সময় বাইরে অবস্থান করতে হয়েছে।’
সচিবালয়ের প্রধান গেটে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসেছিলেন বগুড়ার সোনাতলার বাসিন্দা এ টি এম মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী মালয়েশিয়ার নাগরিক। এক যুগ সেখানে থাকার পর ২০১৬ সালে দেশে আসি। এখন আমার পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়ায় যাব। ভিসাসহ অন্য কাগজপত্র ঠিকঠাক করতে মন্ত্রণালয়ে এসেছি। এখন দেখলাম, কাউকে আজ ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’
আগেরটি বাদ দিয়ে নতুন তদন্ত কমিটি
২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই আগের তদন্ত কমিটি বাতিল করছে সরকার। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে আগের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে আহ্বায়ক এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সদস্য সচিব করে বৃহস্পতিবার রাতে আট সদস্যের এই কমিটি গঠনের তথ্য এক অফিস আদেশে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
অপর সদস্যরা হলেন– পুলিশ মহাপরিদর্শক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক তানভীর মনজুর, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রাসেল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইয়াছির আরাফাত খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান।
তদন্তের প্রয়োজনে এই কমিটি এক বা একাধিক সদস্য (কো-অপ্ট) নিতে পারবে। ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং পরবর্তী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে হবে কমিটিকে।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও কারণ উদ্ঘাটন, অগ্নিদুর্ঘটনার পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়-দায়িত্ব আছে কিনা সেটি উদ্ঘাটন এবং এমন ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ করবে এ কমিটি। সচিবালয়ের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়েও সুপারিশ দেবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এর আগে দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন) মোহাম্মদ খালেদ রহীমকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠন করেছে সরকার।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডগুলোর ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে যুগ্ম সচিব মোর্শেদা আক্তারকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে পৃথক দুটি কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ এবং অগ্নিকাণ্ডের কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন-২) মোহাম্মদ শফিউল আরিফকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যে কারণে আগুন নেভাতে দেরি
সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আগুন লাগার পর তা নেভাতে কেন এত বিলম্ব– তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। ফায়ার সার্ভিসের একাধিক সদস্য বলেন, আগুন নেভাতে পদে পদে বেগ পেতে হয়। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে ঢোকাতে সমস্যা হয়েছে। আগুন নির্বাপণে ফায়ার সার্ভিসের দুটি টার্নটেবল লেডার (টিটিএল) ভেতরে ঢুকতে পেরেছে। যদি আরও বেশি টিটিএল ঢুকতে পারত, অনেক আগে আগুন নেভানো সম্ভব হতো।
সচিবালয়ে ঢোকার মোট ফটক পাঁচটি। তবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার ফটক আছে মাত্র দুটি। ওই দুই ফটক দিয়েও ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি ঢুকতে সমস্যা হয়েছে। ৪ নম্বর ফটক দিয়ে ঢুকতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি ভেঙে গেছে। এর আগে বিভিন্ন সময় সচিবালয়ে ঢোকার ফটক সম্প্রসারণ করার পরামর্শ দেওয়া হলেও কেউ তা আমলে নেয়নি। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ে কাঠ দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করায় আগুন দ্রুত ছড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেন, সচিবালয় ভবন অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সে হিসেবে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়; অরক্ষিতই বলা চলে। আগুন লাগলে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠার কথা। কিন্তু সেখানে বোধ হয় এই ব্যবস্থা নেই বা থাকলেও নষ্ট। সময়মতো ফায়ার ডিটেক্ট (আগুন শনাক্ত) করতে পারলে দ্রুত নেভানো সহজ হতো। কী কারণে আগুন লেগেছে, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। তবে বাইরে থেকে দেখে যেটি মনে হয়েছে, এটি নাশকতা হতে পারে। একই সময়ে তিন জায়গায় আগুন দেখা গেছে। আগুন কীভাবে এত ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট।
এ প্রসঙ্গে সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মাসুদ করিম বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা সঠিক কিছু ধারণা করতে পারছি না। পানিতে অনেক কিছু ধুয়ে গেছে। আমরা যেটুকু পেয়েছি, তাতে উল্লেখ করার মতো কিছু নেই। আমাদের কাজ চলমান।
নিন্দা ও প্রতিবাদ
সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। গতকাল সংগঠনের সভাপতি ড. আনোয়ার উল্ল্যাহ্ ও মহাসচিব মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানানো হয়। এতে বলা হয়, সরকারের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে এমন অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি নজিরবিহীন ঘটনা। বড়দিনের ছুটির পর রাতে জনমানবহীন অবস্থায় সংঘটিত ঘটনাটি সুপরিকল্পিত বলে বিশেষজ্ঞের মতামতে প্রতীয়মান হয়েছে।
নেতারা বলেন, আমরা আরও লক্ষ্য করছি, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বিষয়ে অপরিণামদর্শী ও অযৌক্তিক লেখালেখির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা ক্ষেত্রে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য একটি বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপপ্রয়াসও চলছে।
প্রতিদিনের খবরগুলো আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে নিচের লাইক অপশনে ক্লিক করুন-