রোহিঙ্গা ভোটার: নেপথ্যের চক্র ধরতে বিশেষ অভিযান

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে কোনভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে না পারে সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ভোটার করার কাজের সঙ্গে জড়িত চক্রকে ধরতে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে ইসি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। ইতোমধ্যে এ কাজে জড়িত কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি চট্টগ্রামে লাকী নামে একজন রোহিঙ্গা নারী স্মার্টকার্ড আনতে গেলে সার্ভার থেকে জানা যায় তার এনআইডি সঠিক নয়। এরপর সন্দেহ হওয়ায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায় তিনি রোহিঙ্গা। এরপর তাকে পুলিশে দেওয়া হয়। এর কয়েক দিন পর সার্ভারে আরও ৪৬ জনের অসম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে কারও ফিঙ্গার প্রিন্ট ঠিক নেই, কারও ফরম সঠিকভাবে আপলোড করা হয়নি। তাই সেগুলো চিহ্নিত করে ব্লক করে রাখা হয়েছে। পরে এ ঘটনা তদন্তের জন্য ইসি সচিবালয় থেকে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) একটি বিশেষ টিম গঠন করে মাঠ পর্যায়ে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে সেই টিম কাজ শুরু করে এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজনকে শনাক্ত করে। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় দুই জনকে আটক করা হয়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে ইসির চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা কার্যালয়ের অফিস সহকারী জয়নাল আবেদীনকে আটক করা হয়। আটকদের তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চলছে, সেখানে নেপথ্যে থাকা চক্রের সদস্যদের সন্ধানও মিলছে। তবে তদন্তের স্বার্থে আটকের সংখ্যা ও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি প্রভাবশালী চক্র রোহিঙ্গাদের ভোটার করার জন্য সার্বক্ষণিক কাজ করছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই চক্রকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সার্বিক সহযোগিতা করছেন ইসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিরা।

এনআইডি উইং সূত্র জানায়, তথ্য সংগ্রহকারী দ্বারা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য ও কাগজপত্র সুপারভাইজার দ্বারা যাচাই করা হয়। সেসব তথ্য শনাক্তকারী দ্বারা শনাক্ত এবং যাচাইয়ের পর প্রুফ রিডিং, অ্যাডজুডিকেট, বায়োমেট্রিকসের দ্বৈততা পরীক্ষা করে খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। আর বায়োমেট্রিকস প্রদানের সময় ছবি ও চার আঙুলের পরিবর্তে চোখের আইরিশ ও দশ আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়।

তবে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত ৩২টি বিশেষ এলাকার নাগরিকদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রতিটি এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। এছাড়াও বিশেষ এলাকার নাগরিকদের নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত নিবন্ধন ফরমের অতিরিক্ত বিশেষ ফরম রয়েছে। সেখানে পিতা-মাতার পাশাপাশি চাচা-চাচি, মামা-মামি, ফুফা-ফুফুসহ আত্মীয়স্বজনের নাম দিতে হয়।

Loading...

ইসির কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক নিবন্ধন কার্যক্রমের পর ভোটার নিবন্ধনের আগে ইসির কাছে রক্ষিত ১১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গার ডাটাবেজের সঙ্গে বায়োমেট্রিকসের দ্বৈততা পরীক্ষা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা ডাটাবেজ পরীক্ষার পর কমিশনের নিজস্ব ডাটাবেজ পরীক্ষা করা হয়, এরপর সব ঠিক থাকলে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম চূড়ান্ত হয়। ফলে এসব ধাপ পেরিয়ে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ থাকে না। তবে প্রভাবশালীদের সহায়তায় অনেক অসাধু চক্র এটি করার চেষ্টা করে, কিন্তু যখন রোহিঙ্গা ডাটাবেজে এটি পরীক্ষা করা হয় তখন সেটি অবশ্যই ধরা পড়বে। সেক্ষেত্রে ধরা পড়লে সেই ভোটার তথ্যটি সঙ্গে সঙ্গে ব্লক করে দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বর্তমানেও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত চক্রকে ধরতে অভিযান চলছে।

এদিকে নতুন করে যাতে কোন রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকায় ঢুকতে পারে না পারে সেজন্য ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সাতদিন সার্ভারে নতুন ভোটারদের তথ্য আপলোড করার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। এছাড়া নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে সতর্কতা জারি করে সব আঞ্চলিক, জেলা ও থানা নির্বাচন কর্মকর্তাদের চিঠি দেবে কমিশন।

এ বিষয়ে ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় ঢোকানোর সুযোগ নেই। তবে যারা এটি করার চেষ্টা করেছে তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। আমাদের কাছে ওই তিনজনের বাইরে কে বা কারা আটক আছে, তার পরিচয় ও সংখ্যা তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করতে চাই না। আমরা পুরো চক্রকে ধরতে বদ্ধপরিকর। যেহেতু কমিশনের একজন অফিস সহকারীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, তার পরিচয় আমরা সবাইকে জানিয়েছি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের সহায়তা করছে, পুরো চক্রটিকে ধরতে প্রতিদিনই বিশেষ অভিযান চলছে।

ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান বলেন, কক্সবাজারের আশপাশের ৩২টি উপজেলাকে বিশেষ এলাকা ঘোষণা করেছি। সেখানে গঠিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে বৈঠক করে বার বার সতর্ক করেছি, যাতে বিদেশি বা রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় আসতে না পারে। অভিযুক্ত যাদের আটক করা হয়েছে তারা রোহিঙ্গাদের ভোটার করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু কাউকে ভোটার করতে পারেননি এবং আইডি কার্ডও দিতে পারেননি। শুধু তারা উদ্যোগ নিয়েছে, সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আরও কেউ এই অপকর্মের সঙ্গে জড়িত আছে কি না, সেটাও আমরা দেখছি।

বিদ্যমান আইন অনুসারে বর্তমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম ২০১৯ এর খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে আগামী বছরের ২ জানুয়ারি। ৩১ জানুয়ারি প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা, যার ভিত্তিতে বাংলাদেশি নাগরিক ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হবেন।

/বার্তা২৪