* ডিসির কথার বাস্তবায়ন ঘটছে না *ড্রেনের স্ল্যাব ও কার্পেটিং বাদ *সড়কে ছোট ছোট গর্ত * নির্মাণে ব্যাপক কারচুপির আশ্রয়

এখনো খুঁড়ে খুঁড়ে চলছে কলাতলীর সড়কের সংস্কার কাজ

শহীদুল্লাহ কায়সার :

শহরের কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ সংযোগ সড়ক সংস্কারের যেন শেষ নেই। কখন শেষ হবে তাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনের দেয়া ৪৫ দিনের আল্টিমেটামের মধ্যে গতকাল ৩০ দিন অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু সড়কের বিশাল অংশের সংস্কার কাজ এখনো শুরুই হয়নি। জেলা প্রশাসকের পক্ষে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিদিন সড়ক পরিদর্শন শেষে অগ্রগতি প্রতিবেদন পেশের কথা। কিন্ত তারও কোন বাস্তবায়ন ঘটছে না। ফলে জেলা প্রশাসকের দেয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও পুরো সড়ক সংস্কারের কোন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
উল্টো এখনো খুঁড়ে খুঁড়ে চলছে সড়ক সংস্কারের কাজ। ঠিকাদার শ্রমিকদের দিয়ে নিয়মিত কাজ করাচ্ছেন না। কয়েকদিন কাজ চললেই শ্রমিকদের বিলের কথা বলে কাজ বন্ধ রাখা হয়। এভাবে চলতে থাকলে আরো ৬ মাসেও সড়কটির সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এই প্রতিবেদককে এমন কথাই বললেন নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা।

এক বছরের অধিক সময় ধরে সড়ক বন্ধ করে দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন দেশি-বিদেশি মানুষ। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় লোকজনকে পোহাতে হচ্ছে নানা দুর্ভোগ। এছাড়া সড়কটি দিয়ে দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। সড়ক বন্ধ থাকার কারণে সৈকতের উপর দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে তাঁরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ছেন। সৈকতের বালিয়াড়িতে আটকে যায় যানবাহন। জোয়ারের সময় সেই সমস্যা আরো বেড়ে যায়। বিষয়টি ইতঃপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও জানানো হয়। সেখান থেকে জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেনকে ফোনে সংস্কার কাজের তদারক করতে বলা হয়। এরপর জেলা প্রশাসক নিজে সড়কটি পরিদর্শনের পাশাপাশি পৌরসভাকে কাজ সম্পন্ন করতে দেড় মাসের আল্টিমেটাম দেন। এরপর দ্রুত গতিতে কাজ এগিয়ে নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই আবার আগের মতো ধীরে ধীরে সড়কের কাজ করা হয়। বর্তমানেও ধীরে চলার এই ধারা অব্যাহত।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সড়কের যে অংশে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে তাতে নেয়া হয়েছে ব্যাপক কারচুপির আশ্রয়। ওই অংশের রড, সিমেন্ট, কংক্রিট দিয়ে সম্পন্ন করা হয়েছে নির্মাণ কাজ। এখনো সড়ক গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়নি। অথচ আরসিসি দিয়ে নির্মিত সড়কের কয়েক অংশে গর্ত দেখা যাচ্ছে। অনেক স্থানে কংক্রিট দেখা যাচ্ছে। কয়েক স্থানে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। ফলে গাড়ি চললেই মানুষের গায়ে বৃষ্টির পানির ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়াও নির্মিত অংশে করা হয়নি বিটুমেন কার্পেটিং। ড্রেন নির্মাণ করা হলেও ড্রেনের উপরে স্ল্যাব স্থাপন করা হয়নি। স্থানীয় মানুষকে যে কারণে দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। সড়কে আসতে হলে তাঁদের রীতিমতো কাঠ এবং বাঁশ দিয়ে নির্মিত অস্থায়ী সাঁকোর উপর দিয়ে আসতে হয়।

যদিও কক্সবাজার পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ভিন্ন কথা। এই বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, সড়কটির নির্মাণ কাজের নকশায় বেশ কয়েকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে। ইতঃপূর্বে নকশায় সড়কে বিটুমেনেরর কার্পেটিং এবং সড়ক সংলগ্ন ড্রেনের উপর স্ল্যাব স্থাপন স্থান পায়। কিন্তু পরিবর্তিত নকশায় কার্পেটিং এবং স্ল্যাব বাদ যায়। শুধুমাত্র আরসিসি নির্মিত সড়ক নির্মাণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়।
২৩ জুন সরেজমিনে দেখা গেছে, ডলফিন মোড় থেকে মেম্বারের ঘাটা পর্যন্ত সড়কের অংশের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। কয়েকদিন আগে হওয়া বৃষ্টির পানি এখনো এসব গর্তে রয়ে গেছে। অত্যন্ত ধীর গতিতে সড়কসংস্কার কাজই শুরু করেছে পৌরসভা নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখনো সড়ক সংলগ্ন ড্রেন খননের কাজেই সীমাবদ্ধ সড়ক সংস্কার কাজ। সেই কাজও ঠিকমতো এগিয়ে নেয়া হচ্ছে না।

Loading...

সড়কের পাশেই ড্রেন নির্মাণের জন্য খনন করা হয়েছে বেশ কিছু গর্ত। বৃষ্টির পানি জমে গর্তগুলো মশা-মাছির বংশবিস্তার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পশ্চিম পাশের বেশিরভাগ স্থানে ড্রেন নির্মাণের জন্য গর্তও খোঁড়া হয়নি। এসব গর্ত খনন থেকে শুরু করে ড্রেন নির্মাণ পর্যন্তও ব্যয় হবে অনেক সময়।

সড়কের পাশে গর্ত খোঁড়ার কারণে মডার্ন হ্যাচারির সামনের অংশ একদম ছোট হয়ে এসেছে। সড়ক সংলগ্ন গাইড ওয়াল না ভাঙ্গার কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি। স্থানীয়রা গাইড ওয়াল ভেঙ্গে সড়কের আকার বৃদ্ধির দাবি জানালেও পৌর কর্তৃপক্ষ এতে কর্ণপাত করেনি। ফলে পর্যটন মৌসুমে শুধু এই অংশের জন্যই সড়কটিতে যানজট নিয়মিত হতে পারে।
মডার্ন হ্যাচারির বিপরীত পাশে ড্রেন নির্মাণের কাজ চলমান। সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলফিন মোড় থেকে মেম্বারের ঘাটা পর্যন্ত কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৪১ জনকে নির্মাণ কাজে নিয়োগ দিয়েছে। যাদের মধ্যে ৫ জন রাজমিস্ত্রি এবং ৩৫ জন শ্রমিক। তাঁরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নির্মাণ কাজে অংশ নিচ্ছেন। এতো মানুষ দিয়ে কোরবানির আগে ড্রেন নির্মাণ কাজও সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে জানালেন কয়েকজন শ্রমিক।

অন্যদিকে, ফ্লোরা হ্যাচারি থেকে মেম্বারের ঘাটা পর্যন্ত অংশে আরসিসির কাজ সম্পন্ন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সড়কের পাশের ড্রেনের উপর লাগানো হয়নি স্ল্যাব। সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হলেও দেখলে মনে হয় এখনো সড়কটি কাঁচা। সড়কের অনেক অংশে ছোট ছোট গর্ত দৃশ্যমান। আরসিসির কাজ হলেও ঢালাই ভালোভাবে না করায় এই অবস্থার সৃষ্টি। গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেয়ার আগেই সড়কের উপর ভেসে উঠেছে কংক্রিট। সামান্য বৃষ্টি হলেই যা উঠে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি করতে পারে। সড়কের অনেক অংশ অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে মুক্ত না করায় হয়েছে সংকুচিত।

কলাতলীর বাসিন্দা সমাজসেবক নুরুল ইসলাম দানু বলেন, সড়ক নির্মাণের জন্য একপাশের গাইড ওয়াল ভাঙ্গা হলেও অন্যপাশে অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। এতে সড়ক ছোট হয়ে যাওয়ায় যানজট বেড়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে সড়ক বন্ধ করে দেয়ায় অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ যানবাহনও এখন আমাদের এলাকায় প্রবেশ করতে পারে না। ডিসি আসার পর কাজের গতি কিছুটা বেড়েছিলো। কিন্তু এখন আবারো ধীর গতিতে কাজ করা হচ্ছে। যার কারণে দেশি-বিদেশি মানুষের পাশাপাশি স্থানীয় ১০ হাজারের অধিক মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সি,এন.জি চালক রফিকুল ইসলাম জানায়, সড়কটি বন্ধ রাখার কারণে তার নিজের পাশাপাশি গাড়িরও ক্ষতি হচ্ছে। আগে যেখানে টেকনাফ পর্যন্ত ৩ বার আসা-যাওয়া করতে পারতাম। সেখানে বর্তমানে ২ বারের অধিক চিন্তা করা যায়নি। অনেক সময় সাগরের জোয়ারের কবলে পড়লে একবারের বেশি যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করতে পারেন না। এ কারণে সোনার পাড়া পর্যন্ত ভাড়া ৬০ টাকার পরিবর্তে ৭০ টাকা নিচ্ছেন বলেও জানান রফিকুল ইসলাম।

জানা গেছে, কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ সংযোগ সড়ক সংস্কারের জন্য একাধিকবার টেন্ডার আহবান করে কক্সবাজার পৌরসভা। কক্সবাজার পৌরসভা ২০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে সড়কটি সংস্কারের জন্য। সর্বশেষ সড়কটিকে দুইটি অংশে ভাগ করে আহবান করা হয় টেন্ডার। ইউডিবিবিএইচএম নামে একটি যৌথ মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় একাংশ সংস্কারের কাজ। অন্য অংশ সংস্কারের কাজ পায় হাসান বিল্ডার্স নামে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় এক বছর আগে উল্লিখিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যাদেশও দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান দুটি পৌরসভা নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দেরিতে শুরু করে সড়ক সংস্কারের কাজ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঠিকাদার আসাদ উল্লাহ্ বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের পাওয়া কাজ সম্পন্ন। আমাকে দেয়া কার্যাদেশে স্ল্যাব এবং কার্পেটিং এর কোন উল্লেখ নেই। কাঁচা রাস্তায় টমটম, ট্রাক চলার কারণে কোন কোন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হতে পারে। পৌরসভা বিল দিলে কাজ বুঝিয়ে দেয়ার সময় সেগুলো ঠিক করে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।