টেকনাফের সেইসব বাড়িতে এখনো আঁচড় লাগেনি!

ডেস্ক রিপোর্ট :

কক্সবাজারের টেকনাফের জেলেপাড়া (জালিয়াপাড়া) এক সময় ছিল হতদরিদ্রের ভাঙাচোরা ঘরবাড়ির এক অপরিচ্ছন্ন জনপদ। প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে আসা মরণনেশা ইয়াবা বড়ি বদলে দেয় এখানকার জীবন চিত্র-দৃশ্যপট। সেই জেলেপাড়ায় হঠাৎ গড়ে উঠতে থাকে সুরম্য সব আলিশান প্রাসাদ।

অধিকাংশ বাড়িই গড়ে তোলা হয়েছে মরণনেশা ইয়াবা বড়ি বিক্রির টাকায়। গড়ে তোলা হয় ডুপ্লেক্স আর ট্রিপ্লেক্সের যত বিলাসবহুল বাড়ি। এসব বাড়িগুলোতে দেশের বাইরের মারবেল পাথর, বিদেশী টাইলস ব্যবহার করা হয়েছে। বাড়িগুলোর বাইরের দৃশ্য এতটাই দৃষ্টিনন্দন যে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। বাড়ির ভেতরের প্রতিটি কক্ষ সাজানো হয়েছে বিদেশি আসবাবপত্র ও সামগ্রী দিয়ে।

শুধু জালিয়াপাড়া নয়, টেকনাফের প্রতিটি গ্রাম ও পৌর শহরে এখন শোভা পাচ্ছে ইয়াবা কারবারিদের আলিশান বাড়ি-বহুতল ভবন। গত বছরের মে মাসে দেশজুড়ে মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হলে এসব আলিশান বাড়ির দিকে নজর পড়ে প্রশাসনের।
অক্টোবর থেকে এসব বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে প্রশাসন, যা এখনো চলমান। ইতোমধ্যে রাতের আঁধারে অনেক ইয়াবা কারবারির প্রাসাদোপম বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের ১নং শীর্ষ ইয়াবা কারবারী হাজী সাইফুল করিমের বিলাসবহুল বাড়িটি বুলডোজার দিয়ে আংশিক ভেঙ্গে ফেলা হয়। সর্বশেষ গত ২৬ জুন টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদের বাড়িটি গায়েবী হামলার ঘটনা ঘটে। তবে কে বা কারা এঘটনা ঘটিয়েছে সে বিষয়ে সুনিদৃষ্ট তথ্য মেলেনি। এর আগে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়ার একসময়ের রিক্সা চালক নুরুল হক ভুট্টোর প্রায় ত্রিশ কোটি টাকা মুল্যে প্রাসাদপ্রমো বাড়িটি প্রশাসন দখলে নিয়েছে। আদালতের নির্দেশেই বাড়িটি দখলে নেওয়া হয় বলে জানান টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি ও টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ঘনিষ্ঠ ইয়াবা কারবারির বিলাসবহুল বাড়িতে বুলডোজারের কোনো আঁচড় লাগেনি। কেন লাগেনি তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন স্থানীয়দের। তবে এ ব্যাপারে প্রশাসনও নিশ্চুপ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু আবদুর রহমান বদি কিংবা জাফর আহমদ চেয়ারম্যানের স্বজন-ঘনিষ্ঠরা নয়, যেসব ইয়াবা ব্যবসায়ী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ইয়াবার টাকায় গড়া তাদের বিলাসবহুল বাড়িতেও প্রশাসনের বুলডোজারের আঁচড় লাগেনি। এ রকম দুই শতাধিক বাড়ি সাক্ষ্য দিচ্ছে প্রশাসনের এ দ্বৈতনীতির।

দক্ষিণ জেলেপাড়ায় (জালিয়াপাড়া) ইয়াবা কারবারি মো. জুবায়েরের তিনতলা বাড়িটির বাইরে থেকেই চোখ ধাঁধানো। অথচ বাড়িটির আশপাশের সবগুলোই ভাঙা বেড়ার ঘর, উপরের ছাউনি পলিথিনের। এখানকার নিম্ন আয়ের সব মানুষই দিনমজুর অথবা জেলে। জুবায়ের একসময় ছিঁচকে চোর হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে ইয়াবা কারবারি হয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে যান।
টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, বাড়িটির ভেতরটা জৌলুসপূর্ণ যা সচরাচর শহরেও চোখে পড়ে না।
জুবাইরের বাড়ির কাছেই আরেকটি ডুপ্লেক্স বাড়ির মালিকের নাম মোজাম্মেল, যিনি একসময় পৌরসভার লামার বাজারে একটি পলিথিনের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। পুলিশ তার বাড়ির সীমানা দেওয়ালের কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছে। তবে বাড়িটি অক্ষুন্ন আছে।

টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ এবং তার তিন ছেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি। গত ৫ বছরে তিনি নির্মাণ করেছেন একটি বড় আয়তনের বাড়িসহ তিনটি বাড়ি ও টেকনাফ শহরে একটি তিনতলা মার্কেট। টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দিন ও তার ভাই বাহারছড়া ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দিনও তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি। বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুরানপাড়া গ্রামে তারা নির্মাণ করেছেন দুটি বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি। সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকার ইউপি সদস্য মাহমুদুর রহমানের বাড়িটি চোখ ধাঁধানো। টেকনাফ থানার পাশেই তিনি গড়ে তুলেছেন তিনতলা মার্কেট। সাবরাংয়ের স্বর্ণ চোরাচালানি মাহমুদুল হক মাদুও করেছে বিলাস বহুল বাড়ি, করেছে মার্কেটও।

বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শীলখালী আবুল বশরও করেছে একাধিক বাড়ি। এছাড়াও রোহিঙ্গা নুর হাফেজের হোয়াইক্যং সাতঘরিয়ারপাড়ার বিলাস বহুল বাড়ি, স্থানীয় রাকিব আহমদের বাড়িও অক্ষত। গত তিন বছরের কম বেশি সময়ে নির্মিত এসব বাড়িতেই প্রকাশ্যে চলেছে ইয়াবা কারবার। এজন্য বাড়ির পাহারায় সার্বক্ষণিক লোক নিয়োগের পাশাপাশি বসানো হয় একাধিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। পুলিশের সহযোগিতায় টেকনাফ পৌর এলাকা, টেকনাফ সদর ইউনিয়ন ও সাবরাং ইউনিয়নে ইতোমধ্যে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ৪০টিরও বেশি প্রাসাদতুল্য বাড়ির কম বেশি ভাঙা হয়েছে।

কিন্তু দুই শতাধিক বাড়িই এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৭৩ ইয়াবা কারবারির বেশিরভাগের বাড়িতে কোনো ধরনের আঁচড় পড়েনি। উল্টো এসব বাড়ির মালিকদের কাউকে দেখা যায় থানায়, এমনকি উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায়ও।

টেকনাফ থানা পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত বন্দুকযুদ্ধে বাড়ছে নিহতের সংখ্যা। রয়েছে সরকারের কঠোর নজরদারি। কিন্তু পুরনো ইয়াবা গডফাদাররা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সুবিধায় আছেন। আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের সহযোগীদের বাড়িগুলোই অক্ষুন্ন আছে, এমন অভিযোগ তুলেন অনেকে।

অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ ও সরকারদলীয়দের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মাধ্যমেই তারা দিব্যি রক্ষা করে চলছেন তাদের বাড়ি ও সম্পদ। এমনকি সরকারের চাপে ১০২ ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ করেছে, বেশির ভাগ কারবারী ও বাড়ির মালিক আত্মসর্ম্পণ করেনি।

টেকনাফ থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, যে হারে জনগণ ক্ষেপে যাচ্ছে, তাতে যে কোনো সময় হামলার শিকার হতে পারেন। অনেক ইয়াবা ব্যাবসায়ীর বাড়িতে অজ্ঞাত হামলা হয়েছে। ইয়াবা কারবারিদের ভবিষ্যৎ খুবই খারাপ। আমি শুধু এ টুকু বলতে চাই।

সাবেক এমপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার এক নম্বর ইয়াবা গডফাদার আবদুর রহমান বদির ভাই আবদুস শুক্কুরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারকারি। পৈতৃক পুরনো বাড়িটির পাশে তিনি নির্মাণ করেছেন আরও একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। পৌরসভার অলিয়াবাদে বাড়িটি তিনি দুই বছর আগে নির্মাণ করেন।

আবদুর রহমান বদির অপর ভাই টেকনাফ পৌরসভার মেয়র প্যানেলের এক নম্বর সদস্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাদক ও মানব পাচার তালিকায় শীর্ষস্থানে থাকা মৌলভী মুজিবুর রহমান পৌরসভার চৌধুরীপাড়ায় নির্মাণ করেন নিজের বাড়ি। অপর ভাই ফয়সাল ও শফিক চৌধুরীপাড়াতেই রয়েছে পৃথক বাড়ি। বদির ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেলের তিনতলা বাড়িটি শিলবুনিয়া পাড়ায়। ভাগিনা শাহেদুর রহমান নিপুর বাড়ি সাবরাং। এসব বাড়ি বরাবরই অক্ষত রয়েছে।

টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া, চৌধুরীপাড়া, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া এবং সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়া ও কচুবনিয়া পাড়া, বাহারছড়া এই এলাকার মানুষের কাছে ইয়াবাপাড়া হিসেবে পরিচিত। এর বাইরে হ্নীলা ইউনিয়নের ফুলের ডেইল, দরগাহপাড়া ও সাইটপাড়ার পরিচিতিও একই রকম। এখানে এক দশক আগেও বিলের পর বিল ছিল তরমুজ খেত ও পানের বরজ।

কিন্তু ইয়াবা কারবারের দৌলতে সেসব জমিতে গড়ে উঠেছে যতসব আলিশান বাড়ি। সেই সঙ্গে আশপাশে অনেক জায়গা জুড়ে সুপারির বাগানও করেছেন অনেকে। এসব বাড়ির চারপাশে আছে ইটের তৈরি সীমানা দেয়াল। তবে অতীতের ভাঙা বেড়া ও পলিথিনের ছাউনি দেওয়া কিছু বাড়ি এখনো তাদের অতীতের সাক্ষ্য দিচ্ছে।