হুমকির মুখে বাংলাদেশ, আছে কী সমাধান?

মাহদী হাসান রিয়াদ •

আজ থেকে প্রায় আড়াই বছর আগে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গার ঢল নেমেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সৈকতে।

তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল শিশু। তারা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিল রাখাইনের বীভৎস আক্রমনের কথা; আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি ও প্রতিবেশীদের হারানোর কথা।

মিয়ানমারের সীমানার অদূরে, বাংলাদেশের কক্সবাজারের পাহাড়গুলোতে গাদাগাদি করে বাস করে  এগারো লাখ কিংবা তারও অধিক রোহিঙ্গা। পাহাড়ি বনভূমি উন্মুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই আশ্রয় শিবির। পার্শ্ববর্তী টেকনাফ ও উখিয়াতেও গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্প।

বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়—
২০১৭ সালের আগস্টের শেষের দিকে রাখাইনে বড় মাপের সহিংসতা শুরু হবার পর থেকে আনুমানিক সাত লক্ষেরও অধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।
বাকিরা পাড়ি দিয়েছিলেন আগেই, বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এড়াতে।

০২ মে ২০১৮ তারিখের একটি প্রতিবেদনে ‘দৈনিক প্রথম আলো ‘ জানান;  আন্তর্জাতিক সংস্থা “সেভ দ্য চিলড্রেন”এর  জরিপ অনুযায়ী আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নারীরা  ৫০ হাজার সন্তান জন্ম দেবে ওই  বছরে। ওই সংস্থার তথ্যমতে, ৫০ হাজার হিসাবে বছরের প্রতিদিন অন্তত ১৩০ জন রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নেবে। যা রীতিমতো অবাক নয়, বরং হতবাক করার করে আমাদেরকে!

বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন দেশের সহযোগিতায় রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে এড়ানো গিয়েছে অনেক বড় বিপর্যয়। জরুরি অবস্থার প্রথম থেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ত্রান ও মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য কাজ করেছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন বেসরকারি দাতা সংস্থা।

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে মানবাধিকার কর্মীদের কাজের পরিধি বেড়ে এখন অনেক বড় আকার ধারণ করেছে।

সঙ্কটের প্রথম দিনগুলো চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যদিয়ে পার করে  এই অবধি এসেছি আমরা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশীদের জীবনে নেমে এসেছে এক ধরনের অস্বাভাবিকতা। কিন্তু এই অস্বাভাবিকতা দিনদিন আরো অস্বাভাবিক রূপ ধারণ করেই চলেছে। সে সাথে বাংদেশের আগামী প্রজন্মও আজ চরম হুমকিতে। প্রতিনিয়ত  বহু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন রোহিঙ্গা শিবিরের আশপাশে বসবাসকৃত স্থানীয় জনগণরা।

বহু সমস্যা থেকে দু’একটি বড় ধরনের  সমস্যা সম্পর্কে  আলোকপাত করার মনস্থ করেছি।

প্রথমে বলতে চাই সামাজিক সমস্যা নিয়ে।
সামাজিক সমস্যার কথা বলতে গেলে অনেক কথায় বলতে হয়। কিন্তু এতোকথা বললে লেখাটি বড়সড় একটি উপন্যাস গ্রন্থের আকার ধারণ করবে। যার কারণে মূল পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করতে চাই আমি।

রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে খাদ্য, বাসস্থানের সংকট সেই অর্থে নেই বললেই চলে। কিন্তু নারী নির্যাতন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাহীনতা, মাদক, জঙ্গিবাদের বিস্তারের ঝুঁকিসহ নানা সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছে ইতোমধ্যে। রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিবিরগুলোতে পুরুষ ও যুবকদের কাজ করার সুযোগ নেই। এর ফলে নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন এসব রোহিঙ্গারা। ইদানীং রোহিঙ্গা যুবকরা  জড়িয়ে পড়ছে চুরি,ডাকাতি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি সহ আরো নানান অপরাধের সাথে।

কক্সবাজার শহরের  হোটেল গুলো আজ রোহিঙ্গা নারীদের দখলে। তারা প্রতিনিয়ত দেদারসে  করে যাচ্ছে রমরমা দেহ ব্যবসা! রোহিঙ্গা পতিতাদের টার্গেটের শিখার  হচ্ছেন স্থানীয় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা। এই সমস্যাটিকে মামুলি সমস্যা বলে তাচ্ছিল্য করলেও, আদৌ সেটি মামুলি সমস্যা নয়! বরং এটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ একটি সমস্যা। কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফের বাতিঘর আগামীর উজ্জ্বল নক্ষত্র তরুণ প্রজন্মকে অধঃপতনের মুখে টেলে দিচ্ছে এই রোহিঙ্গা নারীরা। এভাবে চলতে থাকলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষিত কোনো তরুণ খোঁজে পাওয়া যাবে বলে আশা রাখি না আমি।
তারা যৌবনের তৃষ্ণা মেটাতে দেউলিয়া হয়ে একপর্যায়ে লেখাপড়ার প্রতি  বিমুখ হওয়ার আশংকাও প্রবল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Loading...

এনজিও কর্মীদের  বাড়াবাড়ির কথা না বললেই নয়, বড়-ছোটর মধ্যে সামাজিক যেই বৈষম্য থাকা আবশ্যক, তা কিন্তু এদের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে! নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা দেখে যেকেউ ধারণা করে নিবে এরা যেনো ওপেন সেক্স করতে পারা পশ্চিমা  দেশ গুলোর বাসিন্দা! তাদের এই কুরুচিপূর্ণ মেলামেশার কারণে একটি সভ্য সমাজ অসভ্য থেকে চরম অসভ্য পর্যায়ে চলে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে সাথে তরুণ প্রজন্মকে তাদের এহেন নোংরা কর্মকাণ্ডর মাধ্যমে খুব সহজেই শিখিয়ে দিচ্ছে নোংরামি কতো প্রকার ও কী-কী। এই সমস্যাটি কোনো আদর্শবান পিতা-মাতা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেন না। তরুণ প্রজন্মকে অসভ্যতার ভয়াল থাবা থেকে বাঁচাতে এসব নোংরামি বন্ধ  করাটা সময়ের দাবী। অতি শিগগির আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দলবদ্ধ হয়ে রুখে দিতে হবে তাদের এরূপ কলুষিত অবৈধ কর্মকাণ্ডকে।

উখিয়া, কক্সবাজারের বেশিরভাগ কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী আজ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কর্মরত। কলেজের  টোল-টেবিল গুলো শিক্ষার্থী শূন্যতায় ভুগছে বললেই চলে।তাদের পাঠ্যবই গুলো যেনো ছেয়ে গেছে ধুলোবালির ধূসরে। এইতো, গত কিছু দিন আগে কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফের কলেজ সমূহর Hsc পরীক্ষার রেজাল্ট দেখলে তা খুব ভালো ভাবেই কিন্তু আঁচ করা যায়। উপলব্ধি করা যায় এই অধঃপাতের মূল নেপথ্য কী। উল্লেখিত বেশিরভাগ সমস্যায় কিন্তু শিক্ষার্থীদেরকে পড়াশোনার প্রতি আনমনা করে তুলছে রীতিমতো। উক্ত সমস্যা গুলোর সবকটি সমস্যা আজ সমাজের জন্য,দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে!

রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে আপাতত রাজনৈতিক তেমন কোনো সমস্যা আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। বরং কিছু অসাধু  রাজনীতিবিদরা দেদারসে সুবিধা হাসিল করতে মোটেও ভুল করেননি! তারা দলীয় সাইনবোর্ডকে সামনে রেখে বিভিন্ন পন্থায় রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে সুবিধা হাসিল করেছেন। সেটি অবশ্যই দু’এক বছর আগের  পত্রিকার শিরোনাম কিংবা স্থানীয় জনগণের বক্তব্য দ্বারা প্রতীয়মান হয়। বর্তমানেও কিন্তু এই অসাধু
চক্র থেমে নেই, অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদেরকে নিরলস ভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অহরহ রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে গমন করেছে। এর পেছনে কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখলে, নিশ্চয় কিছু হাইব্রিড নেতার চেহারা উন্মোচন হবে বলে আশা রাখছি।

এবার আসি অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে।
অতি শিগগিরই অর্থনৈতিক ভাবে বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে যাচ্ছি আমরা!
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুসারে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার৷ সেই হিসাবে এই ৭ লাখ রোহিঙ্গার মাথাপিছু আয় হওয়ার কথা ১১২ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা৷ কিন্তু আশ্রিত হিসেবে রোহিঙ্গাদের আয়ের কোনো উৎস নেই৷ জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু ব্যয় প্রায় ৭০০ ডলার৷ কিন্তু রোহিঙ্গাদের ব্যয় থাকলেও বৈধপথে আয়ের কোনো উৎস নেই৷ সেই হিসাবে এই ৭ লাখ রোহিঙ্গার  পেছনে সরকারের বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৪৯ কোটি ডলার বা ৩ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা, যা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা৷ বর্তমানে কিছু সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদি এই সাহায্য অব্যহত থাকবে সেটা বলা মুশকিল৷ যখন পাওয়া যাবে না তখন বাংলাদেশকেই কিন্তু এই টাকা খরচ করতে হবে৷ যা বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশের জন্য অসাধ্য প্রায়!

আন্তর্জাতিক সমস্যার কথা বলতে গেলে গা- শিউরে ওঠে! উৎপীড়কদের অমানবিক উৎপীড়নের শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গারা যখন নাফ-নদী পাড়ি জমিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ছিলো, তখন কিন্তু আন্তর্জাতিক মিডিয়া পাড়ায় চলছিলো হৈ-হুল্লোড় । যা অবশ্য বিশ্বের নজর কেড়েছিল।  কিন্তু সে তুলনায় আজকের মিডিয়া পাড়া তূলনামূলক ভাবে নিশ্চুপ বললেই চলে। যার ফলে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিগোচর যাচ্ছে না আরো নানান সমস্যা ।  রোহিঙ্গাদের এই হৃদয়বিদারক ইস্যুটিও আজ টিস্যুই পরিণত হচ্ছে। একদিন হয়তো রোহিঙ্গাদের কথা মাথা থেকে ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলবে আন্তর্জাতিক মহল। এটি অবশ্য বাংলাদেশের জন্য নেতিবাচক একটি দিক।

অলরেডি রোহিঙ্গারা বলতে শুরু করে দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম তাদেরই অঞ্চল।
তারা আশ্রিতা নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দারা জোরপূর্বক ভাবে তাদের ভূমি দখল করে রেখেছে।  এখন এ কথা মুখে বললেও, আগামী পাঁচ বছর পর কিন্তু মুখে না-ও বলতে পারে! হয়ে যেতে পারে ছোটখাটো একটি যুদ্ধও। পরিশেষে আন্তর্জাতিক মহল কিন্তু বাংলাদেশকে বাধ্য করতে পারে তাদেরকে একাংশ দিয়ে দিতে। নয়লে রোহিঙ্গা থাকবে কোথায়? যাবে কোথায়? এসব নানান সমস্যা এবং এবং মানবিকতার দোহাই দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও রোহিঙ্গাদের সুরে গান গাইবে।
ফের আন্তর্জাতিক মহলের মানবতা উতলিয়ে ওঠবে তখন। যেমনটি সিরিয়া এবং ইসরায়েলে দেখেছি আমরা। অতঃপর বাংলাদেশ হবে পাঁঠাবলি!