রোহিঙ্গা পাচারের নয়া পথ মরিচ্যা গোয়ালিয়া রোড

বিশেষ প্রতিবেদক ◑

উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়ে রোহিঙ্গারা যে যার মতো করে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিন আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে স্থানীয় কিছু অসাধু চক্রের সহযোগিতায় সড়ক, উপ-সড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে যাচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তারা সহজে বড় বড় শহর থেকে শুরু বিভিন্ন গ্রামে বসতি শুরু করছে এবং স্থানীয় গ্রামবাসীর সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এদের প্রতিরোধের দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় শংকিত হয়ে পড়েছেন সচেতন মহল।

এদিকে পালাতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কিছু কিছু রোহিঙ্গা আটক হলেও স্থানীয় কিছু অসাধু চক্রের হাত ধরেই তারা প্রতিদিন ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে।

বিশেষ করে কুতুপালং, মধুরছড়া, মাছকারিয়া, শিলেরছড়া, পাতাবাড়ী, লম্বাঘোনা, দরগাহবিল, হাঙ্গরঘোনা, আজুখাইয়া, তুলাতলী, ডেইলপাড়া, করইবনিয়া,মরিচ্যা গোয়ালিয়া পালং, খুনিয়া পালংসহ কয়েকটি গ্রামের বিভিন্ন সড়ক ও উপসড়ক দিয়ে রোহিঙ্গারা চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রতিদিন এসব গ্রামের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে সিএনজি-টমটম যোগে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে তারা।

এছাড়া মরিচ্যা বাজার এলাকার স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জানা যায়, হলদিয়া পালং ইউনিয়নের মরিচ্যা গোয়ালিয়া পালং রেজুর ব্রিজটি রোহিঙ্গা পাচারের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন ক্যাম্প থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাকি দিয়ে টমটম যোগে ২০-৩০ জন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ এনে ওই ব্রিজ দিয়ে রাবেতা হাসপাতাল রোড দিয়ে বের হয়ে লিংক রোড আর রামু হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এদের পালাতে সহায়তা করছে স্থানীয় একটি অসাধু চক্র। যারা রোহিঙ্গাদের থেকে জনপ্রতি ৭০০-১০০০ টাকা নিয়ে পালাতে সাহায্য করছে। অনেক সময় রোহিঙ্গাদের পালাতে সাহায্য করবে বলে এনে ছিনতাই করে সবকিছু লুট করে নেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের অভিযোগে জানা যায়, পশ্চিম মরিচ্যা এলাকার ফরিদ ড্রাইভারের ছেলে টমটম চালক আবছার,আবুল কালামের ছেলে টমটম চালক শাহাজালাল,নুর আহাম্মদের ছেলে টমটম চালক রশিদ মোঃ আলম, আব্দু রকিমের ছেলে মোঃ আব্দুর রশিদ, নুরুল হক ড্রাইভারের ছেলে মুজিবুর রহমান, রশিদ আহমদ আজলার ছেলে জসিম উদ্দিন, ফজলুল হকের ছেলে সোনা আলম, একই এলাকার কালা বাদশা’র যোগসাজশে এ পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা পাচার হচ্ছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করে জানায়। তাদের এ অপকর্মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে চাইলে তারা বিভিন্ন হুমকিধামকি দিয়ে থাকে। যার কারণে কেউ কথা বলতে সাহস পায়না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এম মঞ্জুর আলম জানান, স্থানীয় দালাল চক্র ও অসাধু গাড়ি চালকের সাহায্যে বিভিন্ন মাধ্যমে রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মরিচ্যা গরু বাজার এলাকা হয়ে গোয়ালিয়া পালং রোড দিয়ে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করছে একটি সিন্ডিকেট এমন অভিযোগ পেয়েছি। তাদের প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং যারা রোহিঙ্গা পাচারের সাথে জড়িত তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উখিয়া নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রফিকুল ইসলাম বলেন, উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গারা যেভাবে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে, তা উদ্বেগজনক। মহাসড়কের পাশেই রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ায় তারা সুযোগ পেয়ে ক্যাম্প থেকে সরাসরি বের হয়ে যাত্রীবাহী যানবাহনে করে পালিয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের স্থানীয় কিছু অসাধু চক্র সাহায্য করাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে।

বায়োমেট্রিক পদ্ধতির পর রোহিঙ্গারা সেই গণনা অনুযায়ী ক্যাম্পে আছে কিনা, তদন্ত করে দেখা উচিত বলে মনে করেন উখিয়া উপজেলা পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা দিন দিন বেপরোয়া উঠছে। তাদের অবস্থান মহাসড়কের পাশে থাকায় রাত-দিন যানবাহনে করে ক্যাম্প থেকে অন্যত্র পালিয়ে যাচ্ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা এখন প্রশাসনের কাছে কঠিন হয়ে পড়েছে। লাখ লাখ রোহিঙ্গার উখিয়ায় অবস্থান দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তাই এসব রোহিঙ্গাকে উখিয়া ও টেকনাফ থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা না হলে কক্সবাজারবাসী হুমকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উখিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ নিহাদ আদনান তাইয়ান বলেন, পুলিশ রোহিঙ্গাদের ওপর সজাগ দৃষ্টি রেখেছে। চেকপোস্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশী অব্যাহত রয়েছে। যাতে তারা ক্যাম্পের বাইরে কোথাও যেতে না পারে। অনেক সময় কিছু কিছু রোহিঙ্গা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে গ্রামীণ উপ-সড়ক দিয়ে ক্যাম্প ছেড়ে পালাচ্ছে। তবে দেশের যে কোনো স্থানে রোহিঙ্গা আটক হলে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরো জানান, রোহিঙ্গা পাচারে জড়িত সক্রিয় দালালদের ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।