করোনায় প্রবাল দ্বীপে আটকে থাকা তিন পর্যটকের গল্প

সুজাউদ্দিন রুবেল : করোনা পরিস্থিতিতে ফাঁকা সেন্টমার্টিন দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন তিন পর্যটক। ঘুরতে এসে মহামারি করোনার কারণে সবকিছু লকডাউনের খবরে সেখানেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন রাজধানী ঢাকার এই তিন যুবক। প্রায় দুই মাসের এই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আর অপরুপ এক সেন্টমার্টিনের দেখা পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা। আর এই তিন পর্যটককে বিনা পয়সায় থাকাসহ সব ধরণের সহযোগিতা করছেন দ্বীপের বাসিন্দারা।

সবসময়ই অপরুপ সৌন্দর্যের আধার প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। নীল জলরাশির মাঝখানে প্রবাল পাথরে ঘেরা দ্বীপটির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাথর, শামুক-ঝিনুকসহ অসংখ্য চুনাপাথর। স্বচ্ছ পানির উত্তাল স্রোতের আঘাতে এসব পাথরের গায়ে খচিত হয়েছে বৈচিত্র্যময় সব নকশার। এরকম নানা বৈচিত্র্যের কারণেই হাজারো ভ্রমণপিয়াসুর অবকাশ যাপনের আগ্রহের কেন্দ্র সেন্ট মার্টিন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির কারণ পর্যটকদের পদচারণা না থাকায় সুনশান নিরবতা বিরাজ করছে দ্বীপটিতে। গত ১৫ মার্চ সাতজনের একটি দল ঘুরতে যান সেন্ট মার্টিন দ্বীপে। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় ১৯ মার্চ দ্বীপ ছেড়ে যাওয়া শেষ জাহাজে চারজন ফিরে গেলেও স্বেচ্ছায় থেকে যান এনজামুল, আরশাদ ও সালেহ। আরশাদ পেশায় ব্যবসায়ী, এনজামুল ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করেন এবং সালেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। একটি ভ্রমণ সংগঠনের সদস্য হিসেবে এই তিনজনের পরিচয় ও বন্ধুত্ব। একদিন, দুদিন করে তারা দ্বীপে কাটিয়ে দিয়েছেন প্রায় দুটি মাসের কাছাকাছি। জানিয়েছেন অন্যরকম এক সেন্টমার্টিনের গল্প।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সালেহ রেজা আরিফ বলেন, গত ১৫ মার্চ বন্ধু-বান্ধব মিলে ৭ জন সেন্টমার্টিনে এসেছিলাম। কিন্তু করোনা কারণে গত ১৯ মার্চ শেষ জাহাজটি যখন সেন্টমার্টিন থেকে ছেড়ে যায় তখন বন্ধুদের মধ্যে ৪ জন চলে। কিন্তু আমরা ৩ জন এখানে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। মূলত লকডাউনের খবর শুনে সেন্টমার্টিনে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত। সেই থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় দু’মাসের কাছাকাছি হয়ে গেছে। খুবই ভাল আছি এখানে। নিজেরাই রান্না করছি, খাচ্ছি, ঘুরছি, সৈকতের সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত দেখছি; সব মিলিয়ে অপরূপ প্রকৃতির দৃশ্যগুলো স্বচক্ষে দেখছি। সবকিছু মিলিয়ে দিনগুলো খুব ভাল কাটছে। তারা ৩জনই উঠেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একটি রিসোর্টে। নির্দিষ্ট সময় পর বিনে পয়সায় সে রিসোর্টেরই একটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাঁদের। পর্যটক না থাকায় রিসোর্টের দুজন কর্মীর সঙ্গে এক চুলায় খাবার রান্না করেও খাচ্ছেন এই পর্যটকরা। আর নিজেদের মনে করছেন সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা।

আরশাদ হোসেন বলেন, দেশজুড়ে করোনার প্রকোপ যখন বাড়ছে, তখন অনেকটা নিরাপদেই আছেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের বাসিন্দারা। এ তথ্য দিতে গিয়ে দলটির সদস্যরা বলছিলেন, ২০ মার্চ থেকে বাইরের কাউকে দ্বীপে নামতে দেওয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সদস্যরা কড়াকড়িভাবে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাই দ্বীপের বাসিন্দাদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কম।

আরশাদ আরও বলেন, এখন তো সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দাদের মতো হয়ে গেছি। স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে ঘুরছি, কথা বলছি, সৈকতে যাচ্ছি, মসজিদে যাচ্ছি, নামাজ পড়ছি, বাজারেও যাচ্ছি। ফলে সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সেন্টমার্টিন এখন নিজের এলাকা। রিসোর্টের পাশেই বিশাল সৈকত। ঢেউয়ের শব্দ শুনে ঘুমানো আবার ঢেউয়ের শব্দ শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠা। তারপর সৈকতে ঘুরে বেড়ানো এবং নারিকেল গাছের ছায়ায় বই পড়া। আর প্রতিদিন বিকেলে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সৈকতে বসে কেটে যাচ্ছে তাদের সময়। প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।

এনজামুল হক বলেন, আমরা সে সময় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। চিন্তা করে দেখলাম, ঢাকায় কোনো কাজ নেই, অফিসও বন্ধ থাকবে, করোনার প্রকোপে ইতালি বা স্পেনের মতো অবস্থা হয়, তাহলে তো বাসা থেকে বের হতে পারব না। শেষ পর্যন্ত হিসাব মিলিয়ে দেখলাম, দ্বীপে থেকে যাওয়াই ভালো। অন্তত নির্জন দ্বীপ উপভোগ করা যাবে। সেন্ট মার্টিনের আকাশসেন্ট মার্টিনের আকাশতাঁরা উঠেছিলেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপের একটি রিসোর্টে। নির্দিষ্ট সময় পর বিনে পয়সায় সে রিসোর্টেরই একটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাঁদের। পর্যটক না থাকায় রিসোর্টের দুজন কর্মীর সঙ্গে এক চুলায় খাবার রান্না করে খাচ্ছেন।

এনজামুল আরও বলেন, সবচেয়ে ভালো লেগেছে দ্বীপবাসীর নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় পেয়ে। ভ্রমণ মৌসুমে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বাণিজ্যিক মনোভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যেমন মাছ কাটতে রিসোর্টের পাশের এক বাসিন্দার সহযোগিতা পাই। ভালো কিছু রান্না করলেও তিনি আমাদের দিয়ে যান। অনেকে তো খেতের তরকারিও দিচ্ছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে হল সৈকতে কাছিমের বাচ্চা ছেড়ে দেওয়া। এটা আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় একটি দিন। যা কোন দিন ভুলতে পারবো না। এদিকে এই তিন পর্যটককে সব ধরণের সহযোগিতা করছেন দ্বীপের বাসিন্দারা। বিনা পয়সায় হোটেলে থাকাসহ সার্বক্ষনিক খোঁজ-খবর রাখছেন তারা। ওই ৩ পর্যটককে এখন নিজেদের বাসিন্দা ভাবতেও শুরু করেছেন তারা।

এব্যাপারে সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক এসোসিয়েশনের মুখপাত্র আব্দুল মালেক বলেন, আমার স্থানীয়রা সবসময় তাদের খোঁজ-খবর রাখছি, সহযোগিতা করছি। তারা সার্বিকভাবে ভাল আছে। আর করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত যতদিন তারা সেন্টমার্টিনে থাকবে ততদিন তাদের কাছ থেকে কোন ভাড়া নেয়া হবে না। তিনজনের পরিবার-পরিজন ঢাকাতেই থাকেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও আছে। শুরুর দিনগুলোতে বাড়ির মানুষেরা চিন্তা করলেও এখন বিষয়টি তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন। করোনা পরিস্থিতি কোন দিন স্বাভাবিক হবে আর কোন দিন ফেরা হবে তা জানেন না তারা। তবে সেন্টমার্টিন দ্বীপে জীবনের সোনালি দিন কাটছে এই তিন পর্যটকের।