কক্সবাজার জুড়ে স্বপ্ন প্রাপ্ত ওষুধের অপচিকিৎসা

দৈনিক আজাদী :

বিয়ের ৬ বছর পর একটি ছেলে সন্তানের মুখ দেখেন রাসেল ও হুমায়রা দম্পতি। তাদের বাড়ি কক্সবাজার সদরের সমিতি পাড়ায়। অনেক আকাঙ্ক্ষার এই সন্তানের দেখা পেয়ে খুশির জোয়ার বইছিল টমটম চালক রাসেলের ঘরে। সন্তানের নাম রাখেন ফয়সাল। তবে সেই খুশির জোয়ার স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। ভেসে গেছে বিষাদের সমুদ্রে। এই দম্পতির সাধনার ধন ‘নাই’ হয়ে গেছে গত ১৩ ডিসেম্বর।

চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাত্র ৩ মাস বয়সেই নিভে যায় শিশুটির জীবন প্রদীপ। এর আগে ৭ ডিসেম্বর শিশুটিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে (মেডিসিন) ভর্তি করা হয়। শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি দেখে শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে যান মা-বাবা। কিন্তু স্বাস্থ্যের উন্নতি না হওয়ায় চারদিন পর ১১ ডিসেম্বর সেখান থেকে রেফার করা হয়। ওইদিন মধ্যরাতের পর শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে আনা হয়। শিশু (৯ নং) ওয়ার্ডের ৪৭ নং শয্যায় তাকে ভর্তি দেয়া হয়। তবে স্বাস্থ্যের অবনতিতে শিশুটিকে আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

কিন্তু ওই মুহূর্তে চমেক হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে শয্যা খালি না থাকায় নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শিশুটিকে নিয়ে যান মা-বাবা। এত চেষ্টার পরও সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি তারা। ১৩ ডিসেম্বর রাতে বেসরকারি ওই হাসপাতালেই শিশুটির মৃত্যু হয়। কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে প্রদত্ত ছাড়পত্রে শিশুটি ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া এবং ‘নিয়ানা’ পয়জনিংয়ে আক্রান্ত বলে উল্লেখ রয়েছে।

চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নিয়ানা পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হিসেবে কক্সবাজার থেকে রেফার হয়ে আসা বেশিরভাগ শিশুকেই বাঁচানো যাচ্ছে না। প্রায় সবক’টি শিশু মারা যাচ্ছে। সমপ্রতি ১৩/১৪ জন শিশু নিয়ানা পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হিসেবে এখানে ভর্তি হয়। এর মধ্যে মাত্র একটি শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. আবির দাশ।

শিশু বিভাগের অধ্যাপক ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, সামপ্রতিক সময়ে কক্সবাজার থেকে বেশ কিছু শিশু রোগী এখানে ভর্তি হয়েছে। এসব শিশু ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া অথবা মেনিনজাইটিসের পাশাপাশি নিয়ানা পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হিসেবে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া বা মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হলেও কক্সবাজার থেকে আসা এসব শিশুকে যেকোনো একসময় নিয়ানা খাওয়ানোর তথ্য রয়েছে। আর নিয়ানা খাওয়ানোর ইতিহাস থাকা এসব শিশুর বেশিরভাগ মারা যাচ্ছে।

অথচ, ব্রঙ্কোনিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিসসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রচুর সংখ্যক শিশু এখানে ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ফিরেও যাচ্ছে। যার কারণে কক্সবাজার এলাকার এসব শিশুর বিষয়টি অ্যালার্মিং মনে হয়েছে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের তথ্যও বলছে, নিয়ানা খাওয়া বেশিরভাগ শিশুকেই বাঁচানো যাচ্ছে না। অকালেই ঝরে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। কেবল এক মাসেই (নভেম্বর) নিয়ানা খাওয়া অসুস্থ ১৯ শিশু ভর্তি হয় শিশু ওয়ার্ডে। এর মধ্যে হাসপাতালেই মারা যায় ৮ শিশু। আর ৫ শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার করা হয়। রেফার করা এসব শিশুরও বেঁচে ফেরার আশা খুব কম বলে জানান সদর হাসপাতালের শিশু (মেডিসিন) ওয়ার্ডের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নিয়ানা খেয়ে আক্রান্ত বেশিরভাগ শিশুর বয়স ১ থেকে ৬ মাস। প্রথম দিকে শিশুর পরিবার শিশুকে নিয়ানা খাওয়ানোর বিষয়টি স্বীকার করতে চায় না। পরে কথাবার্তার মাধ্যমে বের হয়ে আসে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ শিশুই নিয়ানা খাওয়ার পর আক্রান্ত হয়ে আসে জানিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরাও খুব উদ্বিগ্ন। এভাবে চলতে থাকলে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

কী এই নিয়ানা : স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা নিয়ানার প্রচলন করে। কম বয়সী কোনো শিশুর পেটে গ্যাস জমলে, শ্বাসকষ্ট ও খিঁচুনি দেখা দিলে কিংবা বেশি কান্নাকাটি করলে রোহিঙ্গারা এটাকে ‘নিয়ানা’ রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এই রোগ সারাতে নিজেরাই এক ধরনের ‘ওষুধ’ বিক্রি শুরু করে, যা স্বপ্নে প্রাপ্ত বলে প্রচার করা হয়। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বেশ কিছু স্থানীয়ও এই কাজে জড়িয়ে পড়ে। ওষুধ হিসেবে ওই অঞ্চলে নিয়ানার প্রচার ছড়িয়ে পড়ে, যা এখনো চলছে। অবশ্য, এ কাজে জড়িত সকলেই মহিলা বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।

চিকিৎসক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিশুর শ্বাসকষ্ট অথবা খিঁচুনি দেখা দিলে অথবা একটু বেশি কান্নাকাটি করলে সন্তান নিয়ে নিয়ানা ওষুধ নিতে ছুটে যান গ্রামাঞ্চলের অভিভাবকরা। এদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত ও অসচেতন। অনেকে কিছুটা সচেতন হলেও পাড়া-প্রতিবেশীর কথায় সন্তান নিয়ে যান। সেখানে গেলে এক ধরনের তেল মেসেজ করে দেয়া হয় শিশুকে। সেই সাথে এক ধরনের পাউডার মিশিয়ে খাইয়ে দেয়া হয়। তাছাড়া সরিষা তেলের সাথে বেশ কিছু উপাদান পানির সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দেয়া হয়। এসব ওষুধের দাম রাখা হয় ১৩০ টাকা থেকে আড়াইশ টাকা।

১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশু ফয়সালের মা-বাবাও সন্তানকে নিয়ানা খাওয়ানোর কথা স্বীকার করেন। চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে থাকাকালীন তাদের সাথে কথা হয়। শিশুটির মা হুমায়রা জানান, শিশুর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে খুব কান্নাকাটি করছিল। তা দেখে প্রতিবেশী কয়েকজন মহিলা নিয়ানা ওষুধ খাওয়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাদের কথায় উপজেলা বাজার সড়কে লারপাড়ায় এক মহিলার কাছে যান তারা। সেখানে শিশুটিকে সরিষার তেল মেশানো এক ধরনের ওষুধ খাইয়ে দেয়। একটি কাচের বোতল (ওষুধসহ) দেয়া হয়। এর জন্য তাদের কাছ থেকে ২২০ টাকা নেয়া হয়। এরকম চার বোতল খাওয়ানোর জন্য বলেছিল মহিলাটি। তবে একটু করে খাওয়ানোর পর শিশুটি বমি করা শুরু করে। পরে সন্তানকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন তারা। এরপরের ঘটনা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার শহরের মগচিতা পাড়া (বিমানবন্দর গেটের সামনে) ও শহরতলীর লারপাড়া (সদর উপজেলা পরিষদের অদূরে) এলাকায় রয়েছেন কথিত নিয়ানা চিকিৎসকরা। প্রতিদিন কম করে হলেও কয়েক ডজন শিশু নিয়ে এখানে হাজির হন অভিভাবকরা। এছাড়া উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, রামু ও চকরিয়াসহ জেলার আরো কিছু স্থানেও নিয়ানার ওষুধ দেয়া হয়। তারা সকলেই আবার মহিলা।

সরিষার তেলের সাথে বিভিন্ন উপাদান মিশিয়ে যে তরলটি খাওয়ানো হয়, সেটি শিশুদের জন্য খুবই ভয়ানক বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. এম এন আলম। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিয়ানার বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু এরপরও নিয়ানা খাওয়ানো বন্ধ হচ্ছে না। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, নিয়ানা খাওয়ানোর পর শিশুর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। মায়ের দুধ খেতে পারে না। মুখ থেকে ফেনা বের হয়। শিশুর শরীরের রক্ত কমে গিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, রোহিঙ্গারা নিয়ানা চালু করলেও তারা তাদের শিশুদের এসব খাওয়াচ্ছে না।

এই ‘বিষ’ জাতীয় নিয়ানা খাওয়া বন্ধ করতে নিজেরা পোস্টারিং করেছেন জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, ‘নিয়ানা কোন রোগ নয়/ নিয়ানা নামে কোন ওষুধ নয়’ লিখে আমরা পোস্টার তৈরি করেছি, যা হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাঁটানো হয়েছে। তাছাড়া হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে যাওয়া প্রতিটি শিশু রোগীর ব্যবস্থাপত্রে নিয়ানা না খাওয়াতে সিল মেরে দিই। মানুষকে বুঝানো হয়। কিন্তু এরপরও এই অপচিকিৎসা থামছে না। মানুষের অসচেতনতাই এর মূল কারণ বলে মনে করেন তিনি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে জানান তিনি।

চিকিৎসকদের পরামর্শ ছাড়া শিশুদের এ ধরনের কোনো ওষুধ না খাওয়াতে মা-বাবাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিন মাহমুদ।

তিনি বলেন, ওষুধটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। এছাড়া সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকেও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখার অনুরোধ জানান তিনি।

এ বিষয়ে অবগত আছেন এবং ল্যাবরেটরিতে ‘নিয়ানা’ পরীক্ষার উদ্যোগ নেবেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুল মতিন। আর এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন।