কক্সবাজার এলএ শাখা থেকে সরানো হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের

আজিম নিহাদ :
অর্জনের ঝুড়িতে একের পর এক ভাল কাজ যুক্ত হওয়ায় গেল বছর ‘শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসন’ হিসেবে জনপ্রশাসন পদক অর্জন করে কক্সবাজার। কিন্তু ভাল কাজের এ দীর্ঘ সারি এখন একটি দুর্নীতির কেলেঙ্কারীতে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

এলএ শাখার দুর্নীতির টাকার বস্তা উদ্ধার এবং সার্ভেয়ার ওয়াসিম টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তারের ঘটনাটি এখন জেলা পর্যায় ছাড়িয়ে মন্ত্রণালয়েও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষ করে ভূমি মন্ত্রণালয় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে বলে জানা গেছে। কারণ এলএ শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ একদিনের নয়।

সুশীল সমাজের লোকজন বলছেন, জেলা প্রশাসনের ভাল কাজ এবং অর্জনগুলো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার মতো। কিন্তু এলএ শাখার দুর্নীতির টাকার বস্তা উদ্ধারের বিষয়টি এখন সবকিছু ম্লান করে দিতে পারে। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু বার বার অভিযোগ উঠে আসছিল, তাই আগে থেকেই প্রতিষেধকের ব্যবস্থা করা দরকার ছিল। এখন দুর্নীতির বিষয়টি পানির মত পরিস্কার এবং প্রমাণিত। তাই এখনো সময় আছে অর্জনগুলো অম্লান রাখতে এলএ শাখার কালো বিড়ালদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিতাড়িত করার। কালো বিড়ালদের বিদায় করতে সক্ষম হলে এলএ শাখার দুর্নীতির সাথে জেলা প্রশাসনের সম্পৃক্ততা নিয়ে মানুষের মাঝে বিরাজ করা দ্বিধাদ্বন্দ্বে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো ট্রলারেন্স নীতি মেনে মন্ত্রণালয় চালান। তারপরও কিছু কিছু জায়গায় কালো বিড়ালরা ঘাপটি মেরে থাকেন। সঠিক অভিযোগ উঠলেই অ্যাকশনে যান মন্ত্রী। তাই শিগগিরই এলএ শাখাতেও দুর্নীতি বিরোধী ভূমিকম্প চলতে পারে।

দুর্নীতিতে অভিযুক্ত সার্ভেয়ার থেকে কানুনগো, অতিরিক্ত এলও এবং এলও পর্যন্ত সবাইকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ চলছে বলেও জানা গেছে।

গত রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারী) বিশেষ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছিলেন, ‘এলএ শাখার বিরুদ্ধে উঠা প্রত্যেকটি অভিযোগ শতভাগ সত্য। কাজেই এটা নিয়ে কাজ করা দরকার। কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। মানুষকে হয়রানি থেকে রেহায় দিতে হবে।’

মন্ত্রীর এই ইঙ্গিতমূলক বক্তব্যের পর জেলা প্রশাসন আরও নড়েচড়ে বসেছে। শোনা যাচ্ছে, দুর্নীতিমুক্ত করতে এলএ শাখা থেকে সবাইকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। নতুন করে আবার সেটআপ দেয়া হবে। শিগগিরই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে বলে দাবী করেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভূমিকম্পের আভাস ইতোমধ্যে দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার, কানুনগো, অতিরিক্ত এলও এবং এলও’রা পেয়ে গেছেন। তাই মহাবিপদ সংকেতের মধ্যেও দুর্নীতির কোটি কোটি টাকা ‘নিরাপদ’ করতে দৌড়ঝাঁপ করছেন।

সূত্রমতে, সার্ভেয়ারদের পর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলও) আবুল হাসনাত শহিদুল হকের বিরুদ্ধে। এই ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা এতই বেপরোয়া যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়ম-কানুনের পর্যন্ত তোয়াক্কা করেন না। সরকারের একজন শীর্ষ আমলার আর্শিবাদপুষ্ট পরিচয়ে প্রভাবের সাথে এলএ শাখায় নয়ছয় করেন তিনি। আবুল হাসনাত শহিদুল হকের দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে অনেক আগে থেকেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবগত। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বা উঠা কোন অভিযোগেরই সুষ্ঠু সুরাহার উদ্যোগ নেয়নি প্রশাসন। তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেয়নি। অভিযোগ রয়েছে তার সহযোগিতায় শহরের বিভিন্ন স্থানে একেকটি দ্বিতীয় এলএ শাখা খুলে বসেছে দালাল চক্র।

ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের মতে, সাইফুল ইসলাম, জাহাঙ্গীর, কবির, রাসেল মজুমদার, মাহবুব রহমান, পিগলু, সাইফুল (২)সহ চিহ্নিত সার্ভেয়ার এবং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এলওদের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। কারণ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সিন্ডিকেট করে অসংখ্য দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। তাদের হাতে পড়ে প্রতিনিয়ত নিঃস্ব হচ্ছে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকেরা। এতবড় একটি কেলেঙ্কারীর পরও যদি এলএ শাখার চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের সরানো না হয় তাহলে দুর্নীতি বা কমিশন বাণিজ্য বিন্দু পরিমাণও কমবে না। হয়রানি থেকেও ক্ষতিগ্রস্তরা মুক্তি পাবে না বলে দাবী তাদের।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, যে অবস্থা সৃষ্টি তা কখনো কাম্য ছিল না। ব্যক্তি অপরাধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কোন ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো প্রশাসনের বদনাম হতে দেওয়া যাবে না। তাই ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের আস্তা ফেরাতে, ঘুষ এবং কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করতে এলএ শাখাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘দালাল বিরোধী এত প্রচারণা চালানোর পরও গ্রাহকরা (ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক) দালালের কাছে যাচ্ছে। চেক পেতে তারা সরাসরি না এসে দালাল ধরছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দালাল বিরোধী অভিযান চালানোর পরও গ্রাহকদের কারণে দালালরা বারবার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু এটাতে সম্পূর্ণ গ্রাহকের দায় আছে। কারণ চেক দেওয়ার সময় গ্রাহকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোন দালালের মাধ্যমে বা কমিশনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের নিচ্ছেন কিনা? চেক নেওয়ার সময় অস্বীকার করলেও পরে ঠিকই অভিযোগ উঠে।’

মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার বলেন, ‘এখন থেকে কমিশন বাণিজ্য এবং দালালমুক্ত করার জন্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে চেক দেওয়ার সময় পর্যন্ত একটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হবে। যেখানে লেখা থাকবে উক্ত চেক পাওয়ার জন্য কোন দালাল বা কাউকে কমিশন দেননি তিনি। যদি কমিশন দেন বা দালাল ধরেন তাহলে শাস্তির আওতায় আনা হবে।’