কক্সবাজারে শুটকি উৎপাদন শুরু : শত কোটি টাকার রপ্তানির সম্ভাবনা

আহমদ গিয়াস •

দেশের বৃহত্তম শুটকি পল্লী কক্সবাজার শহরের সমুদ্র তীরবর্তী নাজিরারটেকে চলতি মাস থেকে শুটকী উৎপাদন শুরু হয়েছে। শীতে আবহাওয়া শুষ্ক থাকায় শুঁটকি উৎপাদন যেমন বেশি হয়, তেমনি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানিও চলে পুরো-দমে। শুঁটকি পল্লীতে অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত ৬ মাস ধরে চলবে শুঁটকি পক্রিয়াজাত করনের কাজ। শুঁটকিকে কেন্দ্র করে উপকূলীয় হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীদের আনাগোনায় মুখরিত থাকবে নাজিরারটেক।

তবে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে গত ২দিন ধরে উৎপাদন কাজ ব্যাহত হয়েছে। আশা করা হয়েছে,সোমবার থেকে আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে আসলে কয়েকদিন পর এখান থেকে পুরোদমে শুটকী উৎপাদন শুরু হবে।

শহরের উত্তর-পশ্চিমাংশে বঙ্গোপসাগরের পাশ ঘেষে প্রায় ১০০ একর বালুচরের উপর গড়ে ওঠা এ শুটকী মহালে পুরোদমে শুটকী উৎপাদনের জন্য প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক প্রস্তুতি শুরু করেছেন।

বর্ষা ও মাছ ধরার উপর অবরোধের কারণে গত ৫ মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল নাজিরারটেক শুটকি মহাল। কিন্তু গত ৩১অক্টোবর থেকে সাগরে পুনরায় মাছধরা শুরু হলে ধীরে ধীরে সচল হয়ে ওঠে দেশের বৃহত্তম এ শুটকি মহালটি। তবে সপ্তাহ পার না হতেই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ধাক্কা খেল শুটকী উৎপাদন। আকাশে রোদ না থাকায় গত ২দিন ধরে উৎপাদন প্রায় বন্ধ।

তবে আগামী কয়েকদিন পর আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে আসলে এখান থেকে পুরোদমে শুটকী উৎপাদন শুরু হবে বলে জানান স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর এসআইএম আকতার কামাল।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হয়ে আসার পর সাগরে মাছ পাওয়া গেলেই পুরোদমে শুটকি উৎপাদন শুরু হবে।

প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুটকী উৎপাদন চলে। তবে বৃষ্টি না থাকলে বছরের অন্যান্য সময়েও কিছু শুটকি উৎপাদন হয়। প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক শুটকি উৎপাদন কাজে নিয়োজিত। যারমধ্যে অধিকাংশই নারী শ্রমিক। সাগরের বালিয়াড়িতে বিশেষ উপায়ে তৈরি বাঁশের মাচার উপর কাঁচামাছ বিছিয়ে সূর্যের তাপে শুকিয়ে তৈরি করা হয় শুটকি। কাঁচা মাছ সূর্যেরতাপে শুকিয়ে শুটকি হতে ৩/৪ দিন সময় লাগে।

এরপর উৎপাদিত শুটকিগুলো বস্তাবন্দী করে ট্রাকবোঝাই করে পাঠানো হয় দেশের বিভিন্নস্থানে। শহরের নাজিরারটেক ছাড়াও মহেশখালী, সোনাদীয়া দ্বীপ, টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ, সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়াসহ জেলার উপকূলীয় সৈকতে শুটকি শুকানো হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি মৌসুমে নাজিরারটেক শুটকি মহালে মাছের গুঁড়াসহ ৫০ থেকে ৬০ হাজার মেট্রিক টন শুটকি উৎপাদন হয়। যার বাজারমূল্য প্রায় দুইশ কোটি টাকা। উৎপাদিত এসব শুটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।

শুটকী মহালের ব্যবসায়ী মো. নুরুদ্দিন কোম্পানী জানান, এখানে রূপচাদা, ছুরি, কোরাল, সুরমা, লইট্যা, পোপা, টেকচাঁদা, হাঙ্গর, ফাইস্যা ও নাইল্যামাছসহ ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছের শুটকি তৈরি করা হয়।

শুটকী ব্যবসায়ীরা জানান, বর্ষাকালে টানা বৃষ্টির সময় ছাড়া বছরের ৬/৮ মাস শুটকী উৎপাদন চলে। ভরমৌসুমে প্রতিদিন গড়ে দুইশত থেকে আড়াইশ মেট্রিক টন করে শুটকী উৎপাদন জয়।

নাজিরারটেক শুটকি ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আতিকউল্লাহ কোম্পানী জানান, প্রায় একশ একর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা দেশের বৃহত্তম এ শুটকী মহালে ছোট-বড়অর্ধশতাধিক আড়ত রয়েছে। এখানে বিশ হাজার শ্রমিক ছাড়াও প্রায় দুই হাজার ব্যবসায়ী রয়েছেন।

তিনি বলেন, দেশের বৃহত্তম এ শুটকী মহাল থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেলেও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া গুণতে হয় অতিরিক্ত। ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে শুটকি উৎপাদনেও ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যার সম্মুখিন হতে হচ্ছে।

জেলা মৎস্য কর্মকতা এএসএম খালেকুজ্জামান বলেন, বঙ্গোপসাগর থেকে আহরণ করা বিশেষজাতের ছোট আকৃতির মাছগুলো দিয়ে শুটকি উৎপাদন করা হয়। এখানে উৎপাদিত শুটকি শুধু কক্সবাজারে নয়, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নাটোরসহ সারাদেশের মানুষের চাহিদা মেটাচ্ছে।

এমনকি এখানে উৎপাদিত শুটকীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। দেশের মানুষের প্রোটিনের চাহিদার একটি বড় অংশ কক্সবাজারে উৎপাদিত শুটকী থেকে পূরন হচ্ছে।