কক্সবাজারে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, কমেছে সচেতনতা

শাহীন মাহমুদ রাসেল ◑

কোন পথে যাচ্ছে কক্সবাজার? এমন প্রশ্ন এখন সচেতন মানুষের মুখে মুখে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের ছোবলের বিপর্যস্ত জনগোষ্টি রক্ষায় কক্সবাজারে শুরু থেকেই ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালানো হয়। লকডাউন করা হয় কক্সবাজারকে।

গত ৮ এপ্রিল পুরো কক্সবাজার জেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকলস্তরের কর্মচারি থেকে কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষে চালানো হয় সচেতনতামুলক প্রচারণা।

এতে প্রথম দিকে সাধারণ মানুষের মাঝে করোনা ভীতি ও সচেতনতা দেখা গেলেও এখন আর তা দেখা যাচ্ছে না। দেশে এখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত, মৃত্যু বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সচেতনতার বিষয়টি যেনো মানুষের মুখে থমকে আছে। বারবার বলা হচ্ছে সামাজিক দুরত্বের কথা। কিন্তু কোথায় সমাজিক দুরত্ব? রাস্তাঘাটে, দোকানপাটে, কোথাও নেই সেই সামাজিক দুরত্বের বালাই।

গত কয়েকদিন থেকে পৌর শহর ও বিভিন্ন উপজেলার চিত্র দেখে বোঝার উপায় নেই যে দেশ মহামারির মধ্যে সময় পার করছে। দোকনপাট খোলা থাকছে যথারীতি। বড় যানবাহন ছাড়া শহর ও শহরের বাইরে ছোট যানবাহন চলছে দাপিয়ে। শহর ছাড়া গ্রামের রাস্তাঘাট, দোকানপাট সবখানে বেড়েই চলেছে মানুষের সমাগম। জেলা প্রশাসন বলছেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বিষয়টির অনেক ঘাটতি পড়ে গেছে। তারা সামাজিক দুরত্বের বিষয়টি মানছেন না। এতে কক্সবাজারের ঝুঁকি বাড়ছে।

কক্সবাজারে করোনা পরীক্ষার ল্যাবের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, সারাদেশের ন্যায় কক্সবাজার জেলাতেও প্রতিদিন করোনা আক্রান্ত নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার কক্সবাজারে একদিনে নতুন করে করোনা আক্রান্ত হয়েছে ১৪ জন। বুধবার নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ জন।

১২মে পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১১১ জন। সেখানে চকরিয়া উপজেলায় ৩৪ জন, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ২৪ জন, পেকুয়া উপজেলায় ২০ জন, মহেশখালী উপজেলায় ১২ জন, উখিয়া উপজেলায় ৯ জন, টেকনাফ উপজেলায় ৭ জন, রামু উপজেলায় ৪ জন। কুতুবদিয়া উপজেলায় এখনো কোন করোনা রোগী সনাক্ত করা হয়নি।

আক্রান্তেদের মধ্যে হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন অর্ধশতাধিক। আগে আক্রান্তের সংখ্যা সীমিত থাকলেও মানুষের মাঝে ছিল সচেতনতা। কিন্তু এখন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও মানুষের মধ্যে মচেতনতার বালাই নেই।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পবিত্র রমজান যতই শেষের দিকে যাচ্ছে লোকজন পথে নামার প্রবণতা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। লকডাউনের শুরুতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা বন্ধ করে সাতকানিয়া-লোহাগাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যাওয়া ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা আর্থিক কষ্টের কথা বলে জেলা ও উপজেলা সদরের মার্কেটগুলোতে ফিরছে। সামগ্রিকভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা আসলেও আগত ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সীমিত আকারে দোকানপাট খোলে বেচা-বিক্রি চালাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সাতকানিয়া লোহাগাড়ায় করোনার প্রার্দুভাব থাকায় আগত ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের নিয়ে করোনা আতংকে রয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল তিনটা পর্যন্ত রামু উপজেলার ফকিরা বাজারের চিত্র ছিল পুরো উল্টো। ব্যস্ততম চৌমুহনী ষ্টশনের চিত্র দেখা গেছে পুরোটা ভিন্ন। সাধারণ দিনের মত চলেছে ছোট যানবাহন, কিছু কিছু বস্ত্রবিতানী পুরোটা না খুলে অর্ধেক খুলে রাখা হয়েছে। ভেতরে চলছে কেনাকাটা। বাইরে দোকানের কর্মচারিদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ক্রেতাদের জানান দেয়ার জন্য। আর ভেতরে চলছে কেনাকাটা।

কিছু দিন আগেও সচেতনতার জন্য পুলিশ কাজ করলেও এখন সাধারণ দিনের মত যানজট নিরসনে কাজ করছে পুলিশ। ঈদের সময় যেমন কেনাকাটা বা শহরে লোকসমাগম হয় তেমনটি দেখা যাচ্ছে।

শহরের বিভিন্ন জায়গায় রাস্তার ধারেও বসছে দোকানপাট। লকডাউনের প্রথম থেকে পুরো এক মাস শুধু মাত্র সবজি বাজারে লোক সমাগম দেখা গেলেও এখন দেখা মিলছে সব জায়গায়। দেখা গেছে, স্বপরিবারে লোকজন বেরিয়েছেন কেনাকাটা করতে। বেশিরভাগ পরিবারের লোকজনদের হ্যান্ডগ্লোভস তো দুরের কথা, মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই। এ অবস্থায় লোকজন কেনাকাটা করে বাড়ি ফিরছেন।

এদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয় এক জেলার লোকজন অন্য জেলার বাইরে যেতে পারবে না। কিন্তু কে শুনে কার কথা। দেখা গেছে, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পাশবর্তি চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন প্রাইভেট কার ও নোহাভর্তি লোকজন আসা যাওয়া করছেন বিভিন্ন উপজেলায়। তেমনি কোনো বাধা বিপত্তি ছাড়াই লোকজন ঢুকছেন কক্সবাজার শহরে।

গত প্রায় দেড় মাস আগে লোকজনের চলাচলের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করে শহরের প্রবেশ মুখে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা চৌকি। কিন্তু প্রথম দিকে লোকজন বা যানবাহন কিছুটা বাধার মুখে পড়লেও এখন আর পড়তে হচ্ছে না। পর্যটন নগরীতে আসা ও যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ধরনের বাধার সম্মুখিন হতে হচ্ছে না। সাধারণ দিনের মত চলাচল করছেন লোকজন। চলছে যানবাহন। এছাড়াও শহরের বেশ কয়েকটি এলাকায় অবাধে সিএনজি চলাচল করতেও দেখা যায়।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আশরাফুল আফসার বলেন, সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা না জাগায় আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারপরও আমাদের মৃত্যুর হার নেই বললে চলে। সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ হওয়ায় ইতোমধ্যে ১৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বাকিরাও সুস্থ হওয়ার পথে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এটি আশা জাগানিয়া। তবুও সবার মাঝে সচেতনতাই কেবল করোনার প্রাদুর্ভাব কমাতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।